অবলীলা | সিলেটাঞ্চলের ভাষায় সামাজিক উপন্যাস

সুখপাখি পোষার লাগি ঝাড়র বাঁশ কেটে যে পিঞ্জিরা বানিয়েছিল তার নাম জাকির মিঞা তালুকদার এবং যার জন্য সুখপাখি পোষেছিল তার নাম মোসাম্মাৎ হেনা বেগম। তারপর কিতা হইছিল… প্রেমবতীর প্রেমে পড়ে বিব্রত হওয়ার আগে ভাগ্যের জোরে লন্ডন আইচ্ছিল আর বউর লগে ঝগড়াঝাঁটি না কইরা সুখে শান্তিতে আছে ই কথা সকলে কইন। সকলতা ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও রাতবিরেতে তারে উড়শে কামড়ায় আর চোখ বুজে বাতাসে ভাসন্ত প্রাসাদ বানায়। এক ভোরে ক্যান-ক্যান গলার গানে ঘুম ভাঙলে ধড়-মড় করে উঠে বসে দু হাতে চোখ কচলায়। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে হেনা বিছানা তুলায় ব্যস্ত হলে হাসার চেষ্টা করে জাকির বললো, “কে সে সাহসী যে শীতের সকালে শীতল জলে গোসল করে? আমি অন্তত পারব না। ঠাণ্ডা পানি আমি ডরাই। আমার হাতে পায়ে কামড়ায়।”
“কথ্য কথার কবিতা আপনাকে অতন্ত দক্ষ কবি বানিয়েছে, শুধু একটা সমস্যা হইছে আর তা হইলো বয়লার নষ্ট। বিহানতিবেলা লটরপটর করলে দেওয়ালের লগে ঠেকা খাইয়া দেওলার লাখান ঠেকবায়, না ইবায় না হিবায়।” বলে হেনা মুখ ভেংচি দেয়। যথেষ্ট কষ্টে কাষ্টহাসি হেসে হাত মুখে ধুয়ে বসারঘরে যেয়ে চা নাস্তা খেয়ে মেয়েকে নিয়ে জাকির বেরিয়ে গেলে রাঁধাবাড়ায় হেনা ব্যস্ত। দুপুর বেলা ঘরে ঢুকে ব্যস্তকণ্ঠে ডেকে জাকির বললো, “বউ গো, জলদি চাইরটা ভাত দে, ভুখে পেট কচলাইয়া মাথা ঘুরার।”
“আথারে পাথারে দৌড়িলে পেটর ভুখে মাথা ঘুরে, হারা বিহান কোয়াই আছলায়?” বলে হেনা দাঁত কটমট করলে জাকির কপাল কুঁচকে বললো, “ভাতর কথা কইতেঔ আভাতির লাখান ঝাৎ করি উঠলে কিতার লাগি?”
“ভাত সালান রান্ধা নায় এর লাগি ঝাৎ করি উঠছি, কোনতা করতায়নি?”
“তোরে আমি কিতা করতাম লো? হেই! আইজ ই বেতমিজর লাখান মাতরে কিতার লাগি? তামচা মাইরানো তমিজ হিকাইলিমো।”
“দোকলারে একলা পাইয়া তুমিও আইজ বেশি মাতিলিরায়।”
“ভুখে পেট কচলার আর তাই ক্যাঁচরম্যাচর করের। বেশি মাতলে কিতা করবে?” বলে জাকির মাথা দিয়ে ইশারা করলে হেনা ব্যস্তকণ্ঠে বললো, “সকলতা সকল সময় কওয়া যায় না। অখন দৌড়িয়া বাজারো যাও। আর হুনো! আমি একটু পরে বারে যাইমো, পারলে ভাত সালন রাইন্ধো আমি আইয়া মজায় মজায় খাইমুনে।”
“কিতা কইলে?”
“কিতা কইতাম কিতা? আমার এপয়েন্টমেন্ট আছে, দেরি হইলে সমস্যা হইব।”
“দেখরায়নি তাই কিজাত বেটি বইনছে? জাগা থাকি ঢুলিছ না, আইজ তোর চুল ছিড়তাম।”
“তোমার নানায় পারছইন্না আমার চুল ধরতা আর তুমি আমার লগে বরফুটানি কররায়। বেশি মাতলে পুলিশ ডাকিলিমো।” বলে হেনা চোখ পাকিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায়।
“ও নানি তুমি কোয়াই গো? ইগোর মাত হুইন্না আমার মাথাত ভিতরে কিতা করের। হেই! কে কোয়াই আছবে জলদি আও, ইগোরে আইজ কিলাইলিমো।” বলে জাকির ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে দু হাতে মাথা চেপে ধরে। হেনা মুখ ভেংচিয়ে আড় চোখে তাকিয়ে বললো, “ত্যানাত ধরার সাহস নাই আর তাইন আমারে কিলাইতা। যেতা মনে কয় ওতা, এর লাগি নাইন্নে তোমার কঠাৎ দিতা গুতা।”
“দেখরায়নি, গুণ্ডাইতর লাখান গুণ্ডিয়া মাতের।”
“মাতমুনানি, আমি অখন ছলাকলা হিকছি। নাইন্নে কইতা, জানলে মাইনষে হাপ লইয়া লেখায় আর না জানলে কুইচ্ছা ডরায়। আমি অখন হাপ কুইচ্ছা চিনি।”
“মেনি লো, মাততে মাততে বেশি মাতিলিরে।”
“বেশি মাতলে কিতা করবায়?”
“বেশি গোসা উঠলে কিল মারি চেগা করিলিমো।” জাকির চোখ পাকিয়ে বললে হেনা দাঁত কটমট বললো, “চেত নাই কমজোরর জোয়ানি ক্ষার আর আনামাতি হুতি থাকি করি সকল বায়দি খাস্তা আমার।”
জাকির আঁতকে উঠে বললো, “ইয়া আল্লাহ! ইগোই ইতা কিতা কইলো?”
“কইছি, দাত নাই বাঘর তড়পানি সার, হাচা কথা হুনলে বুকুত পড়ে ঢেকির পাড়।”
“আইজ ইগো অত বাড় বাড়ছে কিতার লাগি বে? হেই! বেশি উদাইলে কিলাইয়া তলপাটনি বানাইলিমো।”
“উদাইতাম কিতা? আমি তোমার লাখান নায়। আমার শরীলো এখনো জোর চেত আছে, তুমি তো এক্কেবারে নিস্তেজ, হউ যে কইন আড়িয়া বাছুরর তিড়িং বিড়িং বড়াই আর আম্বা, বাঘে ঝাপটা মারলে কয় হাম্বা।” বলে হেনা মুখ ভেংচি দিলে জাকির রাগান্বিতকণ্ঠে বললো, “উভা লো! দুমাদুম কিলাইয়া আইজ তোরে বানাইমো দুম্বা।”
হেনা ব্যঙ্গোক্তি করে বললো, “হ্যেঁ, হারাদিন হম্বিতম্বি আর রাইত হইলে আখাম্বা, বিয়ার আগে কইছলায় দিবায় কিন্তু আইজো দিলায় না একছা মলম্বা। মিস্টার মিঞা মুরব্বি, কোনতা কইলে খালি কও খাইতাম আমি মোরব্বা।”
“রম্ভোরু লো, আইজ তোরে কুসুম্ভা খাওয়াইমো, উভা।”

ই-বইর লিংক

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

ঘৃণিত এবং নিগৃহীত

ঘৃণিত এবং নিগৃহীত

অনিঃশেষ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য বিনাশের অতীতে ফিরে যেতে চাই। স্থায়িত্বের অভাবে অস্থায়ী পৃথিবীতে স্থায়িভাবে বসবাস করার জন্য বাসস্থান বানাই। প্রকৃতপক্ষে এসব করার আমার কোনো দক্ষতা অথবা ক্ষমতা নাই। ইয়া আল্লাহ, আমি অক্ষম এবং অজ্ঞ। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমি অক্ষম, কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই এবং কোনো কিছু আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ হয়ে যখন তখন আমার মৃত্যু হবে। আমি ঘৃণিত এবং নিগৃহীত, একমাত্র প্রশংসাযোগ্য হলেন আপনি এবং সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে।

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

হাজিবাবা | আ্যধাত্মিক উপন্যাস

একমাত্র সন্তানরা নাকি শান্তশিষ্ট, বিধায় বিশিষ্ট হওয়ার জন্য হৃদয় ইংলিস মাধ্যমে লেখাপড়া করছে। বন্ধুরা তাকে অনেক নামে ডাকে। কেউ ডাকে রিক, কেউ ডাকে রিকি, কেউ ডাকে রক আবার কেউ ডাকে রকি। সহপাঠীরা তাকে সহ্য করতে পারে না এবং সে ও খামোখা ভাঁড়ামি করে। যাইহোক, গ্রীষ্মের ছুটি শেষে ইউনির সামনে ফষ্টি-নষ্টি করছিল। হঠাৎ ফ্যাশনসম্মত রূপলাবণ্যবতী ছাত্রীর মুখোমুখি হলে নিজেকে সামলিয়ে হৃদয় বললো, “I am very sorry, please forgive me.”
উত্ত্যক্ত ছাত্রী অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে পাশ কেটে চলে যেতে চাইলে ডান হাত প্রসারিত করে হৃদয় বললো, “Tell me your pet name and I will let you know mine.”
“ইস!” বলে ছাত্রী বিরক্তি প্রকাশ করে থমকে দাঁড়ায় এবং কপাল কুঁচকে তাকিয়ে স্বগতোক্তি করে, “এলোপাথাড়ি দৌড়ে এঁড়ে লোকের খপ্পড়ে পড়লাম কেমনে? জাতে উঠার জন্য এককালীন লোকটা জাতিচ্যুত এবং সমাজচ্যুত হয়েছে। একগাল খাবারের জন্য নাজানি কী করবে? দূরত্ব বজায় রাখলে জাতিগত প্রভেদ এবং জন্মগত স্বভাব বজায় থাকবে নইলে অজাতকুজাতে বজ্জাত জন্মাবে।”
“You are noble and beautiful but I am wilful, not awful.” বলে হৃদয় অপলকদৃষ্টে তাকালে, গম্ভীরকণ্ঠে ছাত্রী বলল, “নিষ্ণাতে নিষ্পত্তি হলে, নিষ্পেষণ নিষ্প্রয়োজন। নিষ্কারণে নিষ্প্রাণ ভাবপ্রকাশ নিষ্ফল হয়েছে। আমি নিষ্পাপ নই, নিষ্পুণ্য শব্দে আবেগ নিষ্প্রবাহ হয়। তোমার হাবভাব নিষ্পাদক এবং সূর্য এখনো নিষ্প্রভ হয়নি। স্বেচ্ছাচারীকে দিগ্দর্শন করে যথেচ্ছাচারিণী হতে চাই না। লেখাপড়া বিরক্তিকর হলে খোঁড়াখুঁড়ির জন্য মনগড়া খোঁয়াড়ে যাও।”
“I am very sorry, are you talking to me?” সভয়ে বলে হৃদয় চোখ কপালে তুললে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছাত্রী বললো, “নিষ্ঠুর তুমি নিষ্ঠাবান হওয়ার চেষ্টা করলে অন্তরাত্মা সন্তুষ্ট হবে। লোকাচারের অর্থ জানলে সমাজের রীতিনীতি অনুযায়ী সামাজিক প্রথা পালন করতে পারবে এবং সকলের মঙ্গল হবে।”
“I am thunderstruck. Someone please call the doctor!” বলে হৃদয় দুহাতে মাথা চেপে ধরে ডানে বাঁয়ে তাকায়।
ছাত্রী মাথা নেড়ে বললো, “প্রবাহিত সময়ের সাথে পাথরের ছায়া নড়ে, চাইলেও আমি অনড় হতে পারব না। নড়েচড়ে সরে দাঁড়ালে তড়বড় করে হেঁটে যাব। নভোনীল শাড়ি পরে নারীরা দৌড়াতে পারে না।”
আরেক ছাত্রী ডেকে বললো, “এই নদী, কী হয়েছে?”
“সুষ্ঠু মাথা নষ্ট করার জন্য ফ্রায়েড রাইস খেয়ে এই লোকটা আমার সাথে ঝগড়াঝাঁটি শুরু করেছে।” বলে নদী মাথা নেড়ে দ্রুত চলে যায়। অন্য ছাত্রীর দিকে তাকিয়ে অবাককণ্ঠে হৃদয় বললো, “Who is she and where is she from?”
“ওরে অবাঙাল, বাংলা শিখে বাঙাল হওয়ার চেষ্টা করলে অন্তত তোর মঙ্গল হবে।”
“নদীর একটা কথাও আমি বোঝিনি। আমার দাদা প্রদাদাকে বকাবকি করেছিল নাকি?”
“শাড়ির আঁচল ধরে জিজ্ঞেস কর যেয়ে।” বলে ছাত্রী দ্রুত চলে গেলে হৃদয় ক্লাসে যায় এবং ছুটির পর সিঁড়িতে বসে গুনগুন করছিল। তাকে বিরক্ত না করে ছাত্রাছাত্রীরা দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত সটকাচ্ছিল। নদী বেরোতে চেয়ে তাকে দেখে চমকে এক পা পিছিয়ে বিড়বিড় করে কিছু পড়ে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় আড়চোখে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে নিম্নকণ্ঠে বললো, “সংস্পর্শ তো দূরের কথা তোমার সংস্রবে আমার সর্বনাশ হবে। সত্বর সংস্ক্রিয়া করলে শান্তি এবং স্বস্তি সংস্থিত হবে। সংস্কৃতি সংস্কারে সংস্কর্তা হলে হয়তো পাশে বসে প্রেমালাপ করব।”
“নদী, দাঁড়াও।” বলে হৃদয় দৌড়ে পাশে গেলে নদী চমকে বুকে থুতু দিয়ে বললো, “হঠাৎ ঠাঠা পড়ে আটানব্বই সের আটার ভুষ্টিনাশ করেছে।”

তারপর পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করে e-book download করুন…

প্রেমোপন্যাস | আ্যধাত্মিক উপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | সামাজিক উপন্যাস |

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

জাতে বাংলাদেশি | সামাজিক উপন্যাস

শুরু…

একজোড়া নরনারী ভালো বাসা খুঁজার জন্য চাল-চিঁড়ে গাঁটে ভরে কাকভোরে বেরিয়েছিল। কায়ক্লেশে ক্লান্ত দুজন মধ্যাহ্নের শেষ অথবা অপরাহ্নের শুরুতে ত্বরিতাহার্যের দোকানে প্রবেশ করে খাদ্যতালিকা দেখে পছন্দের খাবার দেওয়ার জন্য বলে সামনাসামনি টেবিলে বসে। স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা তুলে তাকিয়ে চোখা-চোখি হলে, অপরিকল্পিত ভাবে ভালোবাসার কাঁইবিচি তাদের অন্তর-জোতে উপ্ত হয়। এমন সময়, আধা ফেলে আধা খাই জপে আধানেংটা টেটিয়া একটা দোকানে প্রবেশ করে। হাতে বালা নাকে ফুল গলায় টোটকা-তাবিজ দেখে অবসাদগ্রস্তরা বিষাদ ভুলে রহস্যসন্ধানী হয়। আকস্মিকভাবে তার মোবাইলে অস্বাভাবিককণ্ঠে রিং বাজে, “না খেয়েছে বাঘে, না খেয়েছে রাক্ষসে, দুর্বলের দল কি হাপিশ হয়েছে?”
বাম হাতে ট্রাউজার্স টেনে ডান হাতে মোবাইল কানে লাগিয়ে কর্কশকণ্ঠে টেটিয়া বললো, “অবশেষে গূঢ়তত্ত্ব ফাঁশ হয়েছে, ক্ষমতাসীনরা অক্ষমকে গুম করেছে।”
টেটিয়ার হাঁটাহাঁটি এবং কথা কাটাকাটি শুনে দোষদর্শীদের মাথায় ঠাঠা পড়ে আক্কেলগুড়ুম হয়। তার দিকে তাকিয়ে নিম্নকণ্ঠে নর বললো, “এই লোকটা আজ নিজের ইজ্জত মেরে অন্যকে বেইজ্জত করবে। পেন্টালুন নামিয়ে নেংটি টানে। এই উবরা উপরে পড়লে ঠাট বাটের বারোটা বাজবে। নকুল মরে শেষ হচ্ছে কিন্তু নকুলে দেশ ভরে যাচ্ছে! বেহায়াদের গলাবাজি দেখে হায়ার গলায় ফাঁস লেগেছে।”
নারী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মির্মির দৃষ্টে নরের তাকায়। এক কর্মচারী দ্রুত তাদের সামনে খাবার রেখে গেলে বিনা বাক্যব্যয়ে দুজন খেতে শুরু করে। নারীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নেংটি টেনে আধা খেয়ে আধা ফেলে বেরিয়ে যেতে যেতে টেটিয়া বললো, “ইকড়ি মিকড়ি কামড়া কামড়ি আমি ডরাই।”
নারী চোখ বুজে শিউরে উঠে এবং খাবার খেয়ে আধা কুলি পানক গিলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে নিম্নকণ্ঠে নর বললো, “ইয়া আল্লাহ, আমি আপনার উপাসনা করি। উপায়ান্তর হলে কী করতে আমি জানি না। আশ্রয় এবং আহার্যের জন্য আমি কখনো দুশ্চিন্তা করিনি। সূর্য নামতে শুরু করেছে, আশ্রয়ের আয়োজন এখনো হয়নি।”
নারী তখন টিসুতে মুখহাত মুছে অস্পষ্ট শব্দে আলহামদুলিল্লাহ বলে দাঁড়ালে আবার দুজন চোখা-চোখি হয়। নারী মাথা নত করে দ্রুত হেঁটে বেরোতে চাইলে নর দরজা খুলে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, “After you.”
‘Thank you very much.” বলে নারী হাসার চেষ্টা করে বেরোলে, নর নিম্নকন্ঠে বললো, “অনবদ্য শব্দ ধন্যবাদ থেকে বাদ বাদ দিলে ধন্যা সৌভাগ্যশালী হয়।”
ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে নিম্নকন্ঠে নারী বললো, “স্বস্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ধন্যাকে সে সৌভাগ্যশালী করেছে।”
দোকানের দেওয়াল-বিজ্ঞাপনে Flat to let (couple only) লিখিত দেখে দুজন হতাশ্বাস হয়ে কাঁধ ঝোলায়। নর রেগে বিরক্ত হয়ে বললো, “আক্কেলমন্দের নাতি বেআক্কেল কোথাকর, বেচেবর্তে থাকার জন্য আমি এখন বউ পাব কোথায়?”
নারী দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “অভদ্র কোথাকার! জোড়াতাড়া দিয়ে জড়াজড়ি করাবার জন্য তুমি জোড়াজুড়ি খুঁজতে থাকো। ভালোমানুষ জুটি হলে ভালো বাসার ভাড়া তার সাথে ভাগ করব।”
কপাল কুঁচকে নারীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে নর বললো, “এমন সম্মোহক কিছুর সম্মুখীন আমি কখনো হইনি। হয়তো সত্যপ্রেমের মুখোমুখি হয়েছি? সত্যাসত্য জানার জন্য সুন্দরীকে প্রশ্ন করে সম্মোহিত হলে, সামান্যতম ভুলের জন্য উত্তমরূপে দুরস্ত করা হবে। শুনেছি সুন্দরীদের নাকের ডগায় রাগ থাকে। গায়ে পড়ে ভাব জমাতে চাইলে অত্যহিত হবে। বিপদগ্রস্ত হলে গাছতলে বসে ভেবেচিন্তে সহজে স্থিরসিদ্ধান্ত করতে পারবে। আমার মুখ থেকে যুগলমিলনের ভবিষ্যদ্বাণী শুনলে খালি পায়ে দৌড়াবে।”
তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অস্পষ্টকণ্ঠে নারী বললো, “বিপাকে পড়ে সে-ও কি আমার মত ভালো বাসা খোঁজাখুঁজি করছে, জিজ্ঞেস করব? দেখতে টেটন মনে হচ্ছে। লন্ডনের বাতাস গিলে হয়তো বিপর্যয়গ্রস্ত হয়েছে। ওটার মত হলে মঙ্গলকামীর অমঙ্গল হবে।”
অনিমিখে নারীর আপাদমস্তক দেখে অস্পষ্টকণ্ঠে নর বললো, “গড়ন-গঠনে রূপলাবণ্যবতী। কথার সাথে কাজের সংগতি। হাবভাবে আশ্বস্ত হয়েছি সুন্দরী এখনো কুমারী। আমি বিশ্বাস করি, নিয়তির নিয়ন্ত্রণে নিয়তাত্মা। জুতসই ভাবপ্রকাশে হতে পারবো একাত্মা।”
“তার চোখের দিকে তাকালে আমার অন্তরাত্মা আশ্বস্ত হয়। আচার-আচরণে সংযমীরাই প্রকৃত কৃতাত্মা।” বলে নারী আড়চোখে তাকালে দৃঢ়কণ্ঠে নর বললো, “বেশি ঘাবড়ালে সাহসীরা বলেন, সাহসের নাম লক্ষ্মী। অসমসাহসীর মত প্রস্তাব করব?”
নারী কপাল কুঁচকে অস্পষ্টকণ্ঠে বললো, “অপহারকের মত তাকিয়েছে কেন? রোমহর্ষক চোরাচাহনির প্রভাবে ভয় এবং উত্তেজনায় শিরশির করে শিহরিত হয়েছি। চিন্তা চেতনায় অলীক ভাব বাসা বানাচ্ছে। অবেলায় অপহৃত হলে অসহায় হবো। বৃহস্পতির বারবেলায় একী ভেলকি লাগলো?”
বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে কপালে আঘাত করে নর বললো, “হায় রে হায়! আজেবাজে চিন্তা করতে চাই না আমি এখন বউ পাব কোথায়?”
তার মাথায় হাত দেখে হতাশ হয়ে নারী বললো, “হোটেলে থাকলে এক রাতের জন্য এক সপ্তার বাসা ভাড়া দিতে হবে। দূর ছাই, টেনেটুনে আমি এখন কোথায় যাই?”
নয় ছয় ভেবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে নর বললো, “বাসা ভাড়া করতে চাই। সমস্যা হলো এই বাসার মালিক নবদম্পতির কাছে বাসা ভাড়া দেবে। আমাকে মারধর করলেও আমি এখন বিয়ে করব না। তাবিজ টোটকা আমি ডরাই।”
নারী অবাককণ্ঠে বললো, “আমার সাথে কথা বলছেন নাকি?”
“জি হ্যাঁ।” বলে নর স্বগতোক্তি করে, “ওর বিয়ে হয়ছে কি না জানতে চাইলে কিভাবে জিজ্ঞেস করব, আপনি বিবাহিতা না অবিবাহিতা? বিয়ে করেছ কি? আপনার বিয়া হইগিছেনি?”
“কী হলো, কথা বলছেন না কেন?” বলে নারী চোখের দিকে তাকালে নর বললো, “খামোখা দুশ্চিন্তা করে কণ্ঠনালী পরিশুষ্ক হয়েছ।”
“দয়া করে বুঝিয়ে বলুন।”
“আপনি অবিবাহিতা হলে ভালো বাসার মালিককে বুঝিয়ে বলব, আপনি হলেন আমার নানার চাচাতো ভাইর একমাত্র নাতিবৌ।”
“কী বললেন?” বলে নারী কপাল কুঁচ করলে নর বললো, “আস্তে আস্তে কথা বললে অবুঝে বোঝাব, নইলে উটের মত উঠে পড়ে দৌড়াব।”
“ঠিকাছে আস্তেধীরে কথা বলব। কী জানতে চান দয়া করে বুঝিয়ে বলুন।”
“না মানে আপনার মতামত জানতে চাই। আপনি কি বিবাহিতা? হ্যাঁ বললে খোঁজাখুঁজি সার হবে বলে রাখলাম। সকলে না জানলেও আমি জানি, ছুমন্তর ফুঁকে সাপুড়িয়া খেলা দেখায় আর বারবার এক কাপড় দেখিয়ে কাপুড়িয়ায় চোখে ধান্ধায় লাগায়।”
“আপনার একটা কাথাও আমি বোঝিনি। কী বলতে চান প্লিজ বুঝিয়ে বলুন। দুশ্চিন্তায় মাথা ভার হয়েছে, কিচ্ছু চিন্তা করতে পারছি না।”
“আউলা ঝাউলা মানুষ আমি অবুঝ, কিচ্ছু বুঝিয়ে বলতে পারি না। আপনি সিলটি ভাষা বুঝেন না?”
“আমি কখনো সিলেট যাইনি। আপনি সিলটি নাকি?”
“জি হ্যাঁ। আপনি কোথা থেকে এসেছেন?”
“আমার জন্ম ঢাকায়। গ্রামে কখনো যাইনি।”
“আপনার কথাবার্তা না বুঝলেও এই লোকের সকল কথা ভালোমতো বোঝব। মাতামাতি না করে আপনি শুধু আমার মুখের দিকে থাকিয়ে খলখল করে হাসবেন। দেন-দার হয়ে আমি লেনা-দেনা করব এবং পরে আমরা আপোশে দেনা-পাওনা চুকাব। এখন কনিষ্টাঙুল ধরে আমার বগলে আসো।” বলে নর হাত দিয়ে ইশারা করলে, অবাককণ্ঠে নারী বললো, “যা বলেছিলেন দয়া করে বুঝিয়ে বলুন, আমি কিচ্ছু বোঝিনি।”
“আমি বলেছি, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আপনি খালি খলখল করে হাসবেন।”
“ইয়া আল্লাহ, একী বিপাকে পড়লাম? যাক, আমার নাম পাপিয়া আপনার নাম কী?”
“আকিকা করার আগে বাবার বাবা আমার নাম সামী রেখেছিলেন। এখন সঙ্গিনী হয়ে আমার সঙ্গে আসো পরে অঙ্গাঙ্গি হতে চাইলে চৌদ্দগোষ্ঠীর নাম ঠিকানা হাতেকলমে লিখে দেব।” বলে সামী মাথা দিয়ে ইশারা করে।

| প্রেমোপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | সামাজিক উপন্যাস |

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

অমানী নিশাত | উপন্যাস

অতর্কিতভাবে আকাশ ঝামরিয়ে হাঁড়িয়ামেঘ আর রাঙামেঘের সংঘর্ষে ঘনগর্জন শুরু হলে মেঘতিমিরে পরিবেশ আচ্ছন্ন হয়। এক যুবক মনানন্দে গান গেয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ বাজ ফেটে বিজলি চমকালে, “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বলে সে দৌড় দেয়। অনতিদূরে বাস থেমে দরজা খুলে। নামবে কি না নামবে নিয়ে দুই বান্ধবী দোটানে পড়ে দোনোমনো করে। ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বললো, “তানা-না-না করে ত্বরে নামলে সকলের মঙ্গল হবে।”
“করি কি না করি?” একসাথে বলে বান্ধবীদ্বয় বাস থেকে নেমে আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক তাকায়। চারপাশে আকাশচুম্বি অট্টালিকা তবুও যেন মাথা গুঁজার ঠাঁই কোথাও নেই। এক বান্ধবী বললো, “শাইরা, চল কফি খাব। অনেকদিন হয় গরমাগরম সিঙারা খাইনি।”
“তুই কফি খা আমি পার্কে যেয়ে ঝালমুড়ি খাব।” বলে শাইরা ডানে বাঁয়ে থাকিয়ে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে পার্কে প্রবেশ করলে আকাশ ভেঙে ঝেঁপে বৃষ্টি ঝরে। যেন একেবারের বর্ষণে শহর ডুবাবে। শাইরা দ্রুত হেঁটে গাছের নিচে গেলে যুবক দৌড়ে যেয়ে দু হাতে চুল ঝাড়ে। শাইরা কপাল কুঁচকে তাকালে, যুবক কপট হেসে বললো, “ঠাঠাপড়া মেঘ আমাকে তাড়া করেছে। বাজ ফেটে ঠাঠা পড়েলে আমি ডরাই।”
“আমাকে শুনাচ্ছ কেন, নানীর মত পাথালি কোলে লয়ে অভয় দিতে হবে নাকি?” বলে শাইরা মুখ বিকৃত করে। ওর কথায় কান না দিয়ে যুবক এদিক-ওদিক তাকায়। অনতিদূরে চা’র দোকান দেখে দু হাতে মাথা চেপে ধরে গাছে হেলান দিয়ে বসে মাথা নেড়ে যুবক বললো, “মারধর করলেও এখন আমি চা’র দোকানে যাব না। বাজ ফেটে ঠাঠা আমার মাথায় পড়বে।”
তার কথা শুনে হাসতে শুরু করে শাইরা বললো, “সত্যি ঠাঠাবাজকে ভয় পাও নাকি?”
“ঠাঠাবাজকে আমি ভয় পাই না, আমি তাকে চিনিও না। আপনি তাকে চিনেন নাকি? আমি গুণ্ডামি করি না।”
“এই একটু আগে বলেছ, ঠাঠা পড়ে বাজ ফাটলে আমি ডরাই।”
“ও আচ্ছা। ঠাঠা এবং বাজ দুটাকে আমি ডরাই। একবার সামান্যের জন্য মাথায় পড়েছিল। ভ্যাগিস আমি তখন ভূগর্ভে ছিলাম, নইলে নির্ঘাত আমার মাথার মাঝখানে পড়তো।”
“ভূগর্ভে কী করছিলে?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র