অপ্সরা | উপন্যাস

মানসসুন্দরী শর্মী ব্যাধিনী বেশে বনগহনে ঘোরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ অলীক পরিবেশে প্রবেশ করে কৌতূহলোদ্দীপক হয়। সূর্যাস্তের শুরুতে চাঁদের আলোয় পরিবেশ স্বপ্নীল হলে আকস্মিকভাবে বিদ্রুপাত্মক বাক্য পরিবেশে ভাসে, “ও লো শর্মী! মরি-মরি জপে লজ্জায় লাল হওয়ার জন্য জংলায় এসেছিন কেন?”
“রে কুক্কুট! নিঃসঙ্গ আসলেও তোদের একটাকে মেরেকেটে শিকে পোড়ে খাওয়ার জন্য যথেষ্ট মশলাপাতি সঙে এনেছি। মনে রাখিস! তীক্ষ্ণ তির বুকে বিঁধলে হাঁকাহাঁকির পালা পলকে সাঙ্গ হবে।” দাঁত কটমট করে বলে শর্মী তন্ময় হয়ে কান পেতে ডানে বাঁয়ে তাকায়। অপ্সরা তখন মোহনসুরে গান গেয়ে হাঁটছিল…
“হিরণবরন পাখি জিয়নে মরণে হয়েছে মোর সখি, সুখিনী হওয়ার জন্য হতে চাই সখার মুখোমুখি।”
অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে বিস্ময়াবিষ্ট কণ্ঠে শর্মী বলল, “নিগূঢ় রহস্যে রূপসী হয়েছে রহস্যময়ী আর পরিবেশ হয়েছে রহস্যময়।”
এমন সময় বাতাসে বাঘের হুংকার প্রতিধ্বনিত হলে অপ্সরা পরিবেশে অদৃশ্য হয়। শর্মী চমকে ধনুতে তির সংযোগ করে চারপাশে তাকায়। কিছু দেখতে না পেয়ে হেঁকে বলল, “টাট্টু! দৌড়ে আয়।”
ডাকের সাথে সাথে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। চিকচিকে কালো এবং তেজি আরবি-ঘোড়া সামনের ঠ্যাং তুলে হ্রেষাধ্বনি করে বশ্যত্বের প্রমাণ দিয়ে স্থির হয়ে মাথা নেড়ে কান শরীর ঝাড়ে।
“বাঘের কান্দন শোনেছিলাম।” বলে শর্মী দক্ষ আরোহীর মত লাগাম ধরে রেকাবে পা রেখে টপকি দিয়ে উঠে বসে সামনে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে কান পাতে। কিছু শুনতে না পেয়ে ধনুতে তির সংযোগ করে গায়ের জোরে টানিয়ে ছেড়ে লাগাম ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, “টাট্টু! দৌড়া।”
হ্রেষাধ্বনি করে ঘোড়া মহাবেগে দৌড়ে। দু পা দিয়ে আঘাত করে বার বার ঘোড়াকে উসকানি দেয়, “টাট্টু! আরো রোষে।”
তির গাছে বিঁধলে লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামিয়ে ঝম্পে নেমে ঘোড়ার চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে শর্মী বলল, “ভুসি তুষ খেয়ে তুই খোদার খাশি হয়েছিস! রোষ-জোশের লেশ তোর মাঝে নেই। নিস্তেজ কোথাকার!”
হ্রেষাধ্বনি করে ঘোড়া মাথা নাড়ে। অনতিদূরে শ্বেতকায় বাঘ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গোঙাতে দেখে কোষ থেকে ভোজালি বার করে চারপাশে তাকিয়ে কিছু দেখতে না পেয়ে কান পাতে। বাঘ গর্জিয়ে গোঙালে কিছু লোক আছাড়ি পিছাড়ি খেয়ে দৌড়ে পালায়।
“কাঙালের দল! ধরতে পারলে তোদেরকে আমি আচ্ছা করে ঠ্যাঙাব মনে রাখিস!” রাগান্বিতকণ্ঠে বলে শর্মী ভোজালি কোষে রেখে ঘোড়ার লাগাম ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে বলল, “আপোশে পোষ মানলে আশেপাশে থাকতে পারবে নইলে আজীবন আপসোস করবে। টাট্টু! আগ বাড়, বাগুরা ভেঙে বাঘকে মুক্ত করতে হবে। মুক্ত হয়ে অকৃতজ্ঞের মত আক্রমণ করলে কী করব?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

মানসী | উপন্যাস

আকাশ ঝামরিয়ে পরিবেশ মেঘাচ্ছন্ন হলেও বনবাদাড়ে বসন্তোৎসব। লীলাচঞ্চলে পুষ্পসুবাস। পরিযায়ী পাখিরা তামাবিলে নেমে জলকেলি করছিল। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে তুহিন গুনগুন করে চারপাশে তাকাচ্ছিল। আশেপাশে লোকজন নেই। চোখ বুজে গানে টান দেবে এমন সময় মেঘডম্বর ফেটে তামাবিলে বাজ পড়ে ছ্যাঁৎ করে উঠলে পাখিরা উড়াউড়ি করে। তুহিন বুকে থু থু দিয়ে মাথা তুলে সামনের বাসার দিকে তাকায়। সালোয়ার কামিজ পরিহিত যুবতী তড়বড় করে গাড়ি থেকে নেমে ভোঁ দৌড়ে বাসায় প্রবেশ করার সাথে সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি অঝােরধারে ঝরে, যেন একবারের বর্ষণে বান ডাকবে। ঠাঠার ডরে দাঁত কটকট করে তুহিন দৌড় দিতে চেয়ে সামনের বাসার ছাদের দিকে তাকিয়ে নিম্নকন্ঠে বললো, “বৃষ্টিবিলাসিনী নিশ্চয় অলোকসুন্দরী?”
যুবতী তখন ছাদে উঠে দু হাত মেলে মনোল্লাসে বৃষ্টিস্নান করছিল। বৃষ্টিসজল উজ্জ্বলাকে দেখে কাব্যরসিকের মতো ভাববোলাকণ্ঠে কবিতাবৃত্তি করে…

“বৃষ্টিতে ভিজে জেল্লাময়ী পরিপার্শ্বে কামানল জ্বালিয়েছে। বৃষ্টিভেজা বিতনুকে দেখে মিনমিনে মন চনচনে হতে চাইছে। হে বৃষ্টিবিলাসিনী! তোমাকে বাহুতে পাওয়ার জন্য আমি অপেক্ষমাণ। বরণ করলে অবিস্মরণীয় হবে বর্ষণমুখর বাদলসন্ধ্যা।”

তার মনের কথা মানসীর কানে না পৌঁছে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে অস্পষ্ট হয়। আনন্দোদ্ভাসিত বৃষ্টিবিলাসিনীর প্রাণবন্ত চাঞ্চল্যে তুহিন জীবনীশক্তির সন্ধান পেয়ে আনন্দবিহ্বল হয়ে অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। অবিরলপাতে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করলে বৃষ্টি এবং বৃষ্টিবিলাসিনীকে ধন্যবাদ বলে সে দ্রুত নেমে গোসলখানায় প্রবেশ করে এবং মাথা ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে নিম্নকন্ঠে বললো, “আটানব্বই টাকায় আটান্নটা ঘোঁটনকাঠি কিনেছিলাম, আটাত্তরটা বরাদ্দ করলে আঠাকাঠিতে ঠাঠা পড়েছিল। এখন ঠাঠা গরম চায় চুমুক দিতে হবে নইলে সারারাত দাঁত কটকট করবে।”

এমন সময় বার কয়েক বিজলি চমকালে আনন্দোচ্ছল যুবতী সন্ত্রস্তা হয়। তুহিন শুকনো কাপড় পরে আস্তেধীরে হেঁটে জানালার পাশে যায় এবং দু হাতে কপাট খুলে চৌকাঠে ঠেক দিয়ে সামনের বাসার দিকে তাকায়। বৃষ্টিবিলাসিনী তখনও বৃষ্টিস্নান করছিল। তুহিন মৃদু হেসে শিউরে হাতে হাত মলে দু হাতে মুখ ঢেকে হাঁচি দিয়ে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে আরো কয়েকটা হাঁচি দিয়ে ডান হাতে নাক ঘষে এবং আরো হাঁচি আসতে চাইলে কাঁধ ঝুলিয়ে হতাশকণ্ঠে বললো, “এ কী সর্বনাশ করেছি?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

সত্য প্রেম | উপন্যাস

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, রমণে রমণীয় হয় রমণী এবং রত্নশিল্পীর কলাকৌশলে নীল পাথর হয় নীলকান্তমণি। কিংবদন্তি হলেও রত্নবনিকরা বিশ্বাস করে এবং বাতাসে কানাঘুষো, নীলগিরির গুপ্ত গুহায় সংগুপ্ত নবরত্ন আছে। তা শুনে কেউ আষাঢ়ে গল্প আর কেউ বলে কোটারি যেমন কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে পারে তদ্রুপ নীলগিরিতেও রত্নের খনি থাকতে পারে, এর মানে সত্যাসত্য জানার জন্য সন্ধানী হলে প্রকৃত তথ্য এবং রত্নের সন্ধান মিলবে। যেমন, অনুধ্যানে আত্মান্বেষীরা আত্মদর্শন করে এবং পরমসত্যান্বেষণে সত্যান্বেষীরা চিন্ময় হয়। তত্ত্বানুসন্ধানে সমাজতাত্ত্বিক না হতে পারলেও মনস্তাত্ত্বিক অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক হওয়া যায় এবং আপখোরাকির জন্য স্বার্থান্বেষীরা তক্কেতক্কে ঘোরায়। এমন এক অন্বেষক জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানের অলোক-সুন্দরী উপস্থাপিকার কণ্ঠহারের মধ্যমণি দেখে নবরত্নের অন্বেষক হয়। তার নাম আনীল। বই অভিধান ঘেঁটে নবরত্নের নাম জানলেও নিশ্চিত হতে পারেনি, নীলাচলের নীলগিরি না ওড়িশার নীলগিরিতে তা লুক্কায়িত। গূঢ়তত্ত্ব জানার জন্য উপস্থাপিকার সাথে তথ্য লেনদেন করতে যেয়ে আপাতদৃষ্টে ভালোবাসার সূত্রপাত হয়। তথ্য চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, স্থিরচিত্তে সিদ্ধান্ত করে অভিযাত্রী বেশে বেরিয়ে দেশের নিগূঢ়তম প্রদেশে প্রবেশ করে ব্যস্ততার মিছিলে মিশে অদৃশ্য হলে তার অপেক্ষায় উপস্থাপিকা অপেক্ষিত হয়। বিশ বাইশ বছর পর ভরদুপুরে নীলা নামক যুবতীর মুখোমুখি হলে উদ্ভট কাণ্ড ঘটে। ভয়বিস্ময়ে ভিরমি খেয়ে নীলা এলিয়ে পড়লে আনীল চোখ বুজে অগ্নিমন্ত্র জপে বাতাসে হাত বোলায়। তার হাতের ছায়া মুখের উপর পড়লে চোখ মেলে তার মাথার উপর সূর্যকে দেখে নীলা চিৎকার করে। লোকজন জড়ো হলে নিলীয়মান আনীলের কণ্ঠ নীলার কানে প্রতিধ্বনিত হয়, “নভোনীল শাড়ি পরে নীলা হয়েছ তুমি নীলিমা হতে পারনি। আনীলে নীল মিলে নীলিমা হলেও নীলাঞ্জনাকে নীলা ডাকা যায় না। অলোক-সুন্দরীর নয়ন নীল হলে ওকে নীলনয়না না ডেকে নীলা ডাকা মানানসই।”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

নীলকমল | উপন্যাস

আগামী মাসে দ্বাদশশ্রেণীর পরীক্ষা শুরু হবে। ছাত্র ছাত্রীদের শঙ্কিল মনে বেজায় আতঙ্ক। অনাবশ্যক এবং অত্যাবশ্যক শব্দের অর্থ জেনে ওরা প্রয়োজনে কথা বলে অপ্রয়োজনে একে অন্যকে এড়িয়ে চলে। পাঠানু-রাগী ছাত্র ছাত্রীরা পাঠাগারে বসে পাঠ্যক্রমানুযায়ী পঠন-পাঠনে ব্যস্ত। কলেজাঙ্গনে তাদের দেখা না পেয়ে আস্তেব্যস্তে অন্যরা যেয়ে এককাট্টা হয়। কারো হাতে মিঠা শরবত, কারো হাতে ঠাণ্ডামিঠাই। ইদানীং গায়ে পড়ে তাদের সাথে ভাব জমাতে সবাই মহাব্যস্ত। তা শুধু পরীক্ষা নাম্নী বিপদসংকেত বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলে হয় এবং বরাবরই পরীক্ষাপত্রে শেষ অক্ষর লিখে, কলমের ভাবী কলমিলতা, পুঁথিশালার দুলাভাই চশমাআলা, এসব বলে কটূক্তি করে বিধায় বইপোকারা এবার লাই দিচ্ছে না। কলেজ কামাই করে যারা শিকে পোড়ে ঘুঘু খেয়ে গায়ে মাস লাগিয়েছিল, ওরা একপাশে বসে ভোঁতা বুদ্ধি ধারাবার জন্যে নিদিধ্যাসন করছে। চিন্তার সাগরে থই নেই বিধায় ওরা ঠাঁই পাচ্ছেনা এবং আক্কেলের বালোকাবেলায় বসে ভোঁতা বুদ্ধি ধারাতেও পারছে না।
কয়েক চশমাআলা এক বেঞ্চে বসে ঘি-চমচম চিবাচ্ছিল আর শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল। হঠাৎ কাকতালীয় কণ্ঠস্বর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়, “পরীক্ষাপত্রে প্রশ্নোত্তর লিখতে হবে না, শুধু প্রশ্ন-নম্বর বললে আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার হবে। পরীক্ষা পাশ করলে তোদেরকে আর ভড়কাব না।”
ওরা ঝম্পে উঠে বেঞ্চের পিছনে যেয়ে সভয়ে বললো, “মুহীব, তুই এখানে কী করছিস?”
পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা মল্লের মত তাগড়া মস্তান দাঁড়িয়ে পাছা ঝাড়তে ঝাড়তে উদাসকণ্ঠে বললো, “বই মেললে ছাপারাক্ষরে প্রিয়তমার অবয়ব স্পষ্ট হয়। বিমনা হয়ে চোখ বুজলে, মনশ্চক্ষে মানসীর মুখচ্ছবি দেখি। মনশ্চাঞ্চল্যে বিচঞ্চল হলে, প্রাণোচ্ছল হয়ে খলখল করে হাসে। উদাসদৃষ্টে শূন্য হাতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, মেন্দির রঙ্গে রাঙ্গা প্রেয়সীর হাত ধরে বনবাসে যাচ্ছি।”
একজন সভয়ে বললো, “এসব কীসব বলছিস বুঝিয়ে বল।”
মুহীব বিদ্রুপহেসে মাথা নেড়ে বললো, “ইউনিভার্সিটির উঠানে তোদের সাথে সাক্ষাৎ না হলে, বাপের জন্মে তোরা আর পরীক্ষার দেয়াল টপকাতে পারবে না।”
“কেন?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

সুতনুকা | ভালোবাসার গল্প

ভালোবাসার_গল্প

সায়ংকালে সূর্য ডুবতে শুরু করেছিল। ভাসমান মেঘের সাথে চাঁদ লুকোচুরি খেলছিল। পরিবেশে মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। এক উদাসী তার প্রিয়তমার জন্য অপেক্ষা করছিল। নিঃসঙ্গ এবং মর্মাহত, সাগরসৈকতে হাঁটছিল এবং কড়ি কুড়াচ্ছিল। যা তার মনকে বিবেশ করছিল। যথেষ্ট কড়ি কুড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে বসে অগণ্য ঢেউ গোনছিল। অবুঝের মত পানিতে হাত দিয়ে চাঁদকে স্পর্শ করবে এমন সময় এক অপরূপা তার সামনে আবির্ভূত হয়ে বলল, ‘কা’র জন্য অপেক্ষা করছ?’
উদাসী চমকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি আমার প্রিয়তমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’
অপরূপা একটা পাথরে বসে তার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে। উদাসী এগিয়ে যেয়ে বলল, ‘আমি জানতে ইচ্ছুক, তুমি কে বা কী?’
‘বিরহিণী আমি আমার প্রিয়তমের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার পাশে বসো।’
উদাসী মাথা নেড়ে বালিতে বসে কড়ি নিয়ে খেলতে শুরু করে আড়দৃষ্টে তাকিয়ে বলল, ‘ইতিপূর্বে তোমাকে দেখিনি।’
‘এখানে কি সচরাচর আসো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি কি নিঃসঙ্গ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার হাবভাবে মর্মব্যথা বিদ্যমান, কেন বলবে?’
উদাসী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘প্রেম একটা শব্দ মাত্র, তাই না?’
‘হ্যাঁ, প্রেম একটা শব্দ মাত্র।’ বলে অপরূপা বিচলিত হয়ে মাথা দুলায়। উদাসী পাথরে পিঠ রেখে সাগরে কড়ি ছুঁড়ে বলল, ‘প্রেম আরাধ্য এবং কাম ঘৃণ্য। কামিনীর কামনায় বারার কামার্ত হই।’
‘তুমি সত্যি মর্মাহত, তাই না?’
‘হ্যাঁ, আমাকে আমার প্রিয়তমা মর্মাহত করেছে।’
‘আমিও মর্মাহত।’ বলে অপরূপা দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। উদাসী চোখ বুজে চিৎকার করে বলল, ‘কেন প্রেমে মজেছিলাম বিরহানলে দগ্ধ হওয়ার জন্য?’
অপরূপা পিছন ফিরে বলল, ‘প্রমা নন্দে ভরপুর এবং প্রেম হল নন্দিত হওয়ার জন্য।’
‘সত্যাসত্য না জেনে আমি নন্দিত হওয়ার মানসে সানন্দে নিরানন্দ হয়েছি।’
‘আক্রোশে নিরাশ হলে তুমি নিষ্প্রতিভ হবে, সাঁতারুর জন্য নিষ্ফল আক্রোশ নিষ্প্রয়োজন।’
‘নিরাশ আমি মর্মাহত। স্বপ্নহীন শয়ন আমার জন্য কষ্টদায়ক, বিচ্ছেদের রাত স্যতি যন্ত্রনাদায়ক।’
অপরূপা পিছু হেঁটে বলল, ‘আমি তোমাকে কী ডাকব?’
উদাসী ঝম্পে ওঠে বলল, ‘কী ডাকতে চাও?’
অপরূপা দুষ্টুহাসি হেসে বলল, ‘প্রেমী ডাকি?’
‘আহ, বড্ড লেগেছে।’
‘আমি কী করলাম?’ বলে অপরূপা খিল খিল করে হাসে।
‘আমি জানি তুমি নরফাঁদ। দয়া করে ভোঁয়া ধরে টান দিয় না, সত্যি কষ্ট হয়।’
‘আমার প্রেমী আর কখনো ফিরবে না।’
‘আমিও অপেক্ষা করছিলাম মাত্র।’
‘কার জন্য?’
‘উদাসিনীর জন্য।’
‘কেন?’
‘আমি চাই দুঃখ ব্যথার ভাগ করি।’
‘আমার সাথে ভাগ করবে?’
‘প্রমা তুমি আমার জন্য দৃষ্টিভ্রম।’
অপরূপা হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি আমাকে প্রিয়তমা ডাকতে পারবে।’
উদাসী বুকের বামপাশে হাত রেখে বলল, ‘এখন তুমি আমার হৃদয় ধরে টানছ এবং আমার পেটে কাতুকুতু হচ্ছে।’
‘কেন?’
‘প্রিয়দর্শিনী তুমি স্বপ্নচারিণী।’
‘হয়তো। কিন্তু, তুমি হলে হস্থপূর্ণ এবং আমি তোমার বাহুতে আবদ্ধ হেত চাই। দয়া করে এগিয়ে এসে বলো, রূপসী আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
‘আমি বলতে চাই কিন্তু তুমি মানবিকা।’
‘নিঃসঙ্গ আমি অলোকসুন্দরী মাত্র।’
‘যৌবনমদমত্তা…।’
‘আমাকে একটা কবিতা শুনাও।’
‘আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক।’
অপরূপা কাছে যেয়ে অনুপলে তার অধর চুমে বললল, ‘এখন কী?’
উদাসী ধপাস করে বালিতে বসে বললাম, ‘ওটা কী ছিল গো?’
অপরূপা অট্টহাসি হেসে বলল, ‘প্রেমচুম্বন।’
উদাসী দুহাত উঁচিয়ে বলল, ‘আমাকে আমার গন্তব্যে নিয়ে যাও।’
অপরূপা হাসতে হাসতে বলল, ‘সবাই বাঁচার জন্য মরনপণ করে। তুমি মরতে চাও কেন?’
‘আমি মরতে চাই, কারণ…।’
‘কথাগুলো বলো।’
উদাসী হাসতে হাসতে বলল, ‘আমাকে তোমার সাথে কাম করতে দাও। আমি তোমার কামনাকে ক্লান্ত করব, তুমি নন্দিতা হবে প্রাণবন্ত।
‘হে অনামিক।’
উদাসী হাঁটতে শুরু করে হাত নেড়ে বলল, ‘আমাকে প্রিয়তম ডাকো, ফিরে তাকাব।’
‘তোমার নাম বলো, হাত ধরে হেঁটে আমরা নিধুবনে যাব।’
‘আমি চাই আমার প্রিয়তমা আমার সাথে প্রেম করুক, আমি যেমন করে প্রেম করতে চাই।’
অপরূপা ডেকে বলল, ‘আমাকে ভালোবাসা শিখালে আমি তোমাকে ভালোবাসব।’
‘প্রেমে ঘাটের-মড়া মনকে উজ্জীবীত করে এবং প্রিয়তমা হলো প্রেমের জন্য।’
‘ফিরে তাকাও, দৌড়ে তোমার উরে আসব।’
‘পথচারী আমি পথ চলছি, পৃথিবী এখন প্রেমহীন, উদাস আমি হতাশ, প্রিয়তমা হলো আনন্দদায়িনী, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
‘তোমার দুঃস্বপ্নের ভিতর প্রবেশ করে আমি তোমাকে ভয় দেখাতে চাই না। পিছন ফিরে তাকাও এবং আমাকে উরে টানো।’
‘ডান হাত বুকের উপর রেখে গলার জোরে বলো, পথিক আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসো আমাকে যেমন করে আমি ভালোবাসা চাই এবং নিঃসঙ্গতা সমাপন হবে ভালোবাসায়।’
অপরূপা দৌড়ে যেয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ভালোবাসি তোমাকে আমি ভালোবাসা চাই তুনপরশ।’
উদাসী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুহাসি হেসে বলল, ‘জেল্লায় উজ্জ্বল পরমা সুন্দরী মদলসা মোহিনী তুমি দুধে আলতা রূপে ধনি চিকনবরণী, আপাতদৃষ্টে তোমাকে দেখে আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম মোহিত। কামনা মনে কামেচ্ছা, চোখে নেশা, অধরমধু পান করিয়ে মাতোয়ালা করো আমাকে। তোমাকে হাসাবার জন্য ঝাঁপটে ধরে চাঁদকে টিপ বানিয়ে দেব কপালে। বাহুতে আসো, কামনার নিবৃত্তি করে দাও উদাসিপনার পরিসমাপ্তি, হাত ধরো বরণ করব, কলঙ্ক হবে না কেচ্ছা। কামর্ত আমি মনে কামেচ্ছা। বাহুতে আসো মিটবে দুজনার মনের ইচ্ছা। দুষ্ট পাজি লক্ষ্মীছাড়া অপদার্থ নই আমি নচ্ছার। দোহাই সদয় হয়ে বলো আচ্ছা। সুখিত হতে চাই আমি তোমার আঁজলায় রাখতে চাই আশায় পূর্ণ পেয়ালা, মনকে বানাব তোমার প্রহরী। দোহাই তুমি গাঁইগুইঁ কর না, অনেকে বলে প্রেম আজকাল অচল হয়েছে, ছলে বলে আমি তোমাকে রাজি করতে চাই না, তবে দুনিয়ার যত বাজে জিনিস দোকানিরা আমাকে দেয় গছিয়ে, একগাদা টাকা গেল সাথে দিতে চাই না আর গচ্ছা। বাহুতে আসো মিটবে দুজনার মনের ইচ্ছা।’
‘মনের বনে বিয়ের ফুল ফুটেছে, মেন্ধি গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে দেখেছি আমি বনফুলে বরণ মালা গেঁথেছি। তুমিও যৌবনা হয়েছ, সাথি প্রয়োজন, জীবন পথ একা চলা যায় না। সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করার জন্য মরমি চাই, বান্ধব হব বান্ধবী হলে, মনে মনে মিলে কুষ্টির মিল করতে চাইলে গুরুজনরা শুভেচ্ছা প্রকাশ করবেন আশিস, নিশি ঘনাচ্ছে, সুখবাসরে তনুমিলন হবে দুহে, জানি কামর্তার মনে কামেচ্ছা।’
‘আমার মনে দানেচ্ছা। বাহুতে আসো মিটবে দুজনের মনের ইচ্ছা। অপরিসীম স্বাধীনতা ভোগের অলৌকিক শক্তি আছে মনে ভোগেচ্ছা পূর্ণ করার ক্ষমতা, নরীর ধর্মনষ্ট করা যায় বল খাঁটিয়ে ভালোবাসা আদায় করা যায় না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মরণপণ করেছি দেখো বরণ মালা হাতে, এগিয়ে আসো পবিত্র মনে বিশ্বাস করো আমাকে, হাতে রেখে হাত যা জানতে চাও জিজ্ঞেস করো যদি তোমার মনে থাকে পৃচ্ছা, দোহাই প্রকাশ করো না অনিচ্ছা। কামর্তের মনে কামেচ্ছা। বাহুতে আসো মিটবে দুজনের মনের ইচ্ছা। কামাজ্বরে তনে জ্বলছে কামাগ্নি, তাপে কামনা বাষ্প হবে ঘাম, স্বেচ্ছাচারকারী নই আমি উচ্ছৃঙ্খল, নিজ ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে আমি নিজের খেয়ালখুশিতে কাজ করি, কাম করি না বিনাবেতনে, বরণ করে সাংসারী হলে দুজন সেবায় যুক্ত হব, সাধ কামনা মনে অভিলাষ আছে, শখ করে সাধে ধরা দাও স্বেচ্ছায় নিজের ইচ্ছা বাসনা পুরণ হবে সদিচ্ছা। বাহুতে আসো মিটবে মনের ইচ্ছা।’

-সমাপ্ত –

বইর নাম — আঠারোটা অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র