হৃদনন্দী

ভালোবাসার_গল্প

ভরদুপুরে সময় নির্ণয় করার জন্য আকাশের দিকে তাকালে ঠাঠাপড়া রোদে সূর্যকানা হতে হয়। বৈশাখ মাস, ধান কেটে মাড়াই দিয়ে কৃষকরা আমোদ প্রমোদে মত্ত। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে প্রতি বছরের মত এবারও যুবক যুবতি ছুটি কাটাবার জন্য গ্রামে এসেছে। দুজনের নানাবাড়ী একগ্রামে। গ্রাম তাদের জন্য দুঃসাহসিক অভিযানের একদম উত্তম স্থান। অত্যধিক সাহসের প্রবণতা দেখে সবাই তাদেরকে যত্নআত্তি করে। ঠিক দুপুরবেলা পুকুর ঘাটের আমগাছের ডালপাতা নড়তে দেখে সুপিয়া সোঁটা টেনে দৌড়ে যায়। গ্রামের জোয়ানরা জানে ওর নানা এই গাছের আম খুব পছন্দ করেন। বিধায় হাজিসাহেবের পুকুর পারের গাছে কেউ ওঠানামা করে না। গাছে পাকা আম দেখে ওরা লোভের মুখে জলপাই গুঁজে মিঠা আমাকে চুকা বলে মনকে প্রবোধ দেয়। তা সুপিয়া জানে বিধায় সোঁটা সাথে নেয়। গাছের ডালে বসা পিরের নাতি গূঢ়তত্ত্ব জানেন না। উনি ডালে বসে বুলবুলির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পিরের নাতি হওয়ার সুবাদে উনি চুরি করেন না। উনার নানা বলেছেন চুরি করে হাতেনাতে ধরা পড়লে কব্জি কেটে ফেলবেন। সাধু মশাই বুলবুলির অপেক্ষায় অধৈর্য প্রায়। বুবুলিরা তেঁতুলগাছে বসে গুনুগুন করে উনার কাণ্ডকারখানা দেখছিল। সুপিয়া গাছের নিচে যেয়ে ভেটকি দিলে সাধুমশাই চমকে ওঠেন। উনি শহুরে মস্তান হলেও সুপিয়ার ধমকে উনার সাহসের বারোটা বাজে।
‘তোর এত সাহস, জেনেশুনে অথবা বুঝেশুঝে পুকুর পারের গাছের আম চুরি করতে এসেছিস। চোরের বৈরী বাটপাড়, আজ তোকে যমের জেলে চালান করব।’ বলে সুপিয়া শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজে সোঁটা দিয়ে গুঁতা মারার জন্য প্রস্তুতি নিলে সাধুমশাই বললেন, ‘দেখো, আমি হলাম দক্ষিণ পাড়ার পিরসাহেবের নাতি। আমি তোমার গাছের আম চুরি করে খাইনি। ডালে বসে বুললির জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘এই সাধুর নাতি চোর, তুই কি জানিস না অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশি সংক্রান্ত হলে বিভ্রান্ত হতে হয়। বুলবুলিরা তা জানে বিধায় এই গাছের আশে পাশে ওরা আসে না। দাঁড়া, আজ তোকে গুঁতিয়ে মারবো।’ বলে সুপিয়া সোঁটা উঁচায়। সাধুমশাই দোহাই দিয়ে বললেন, ‘হৃদনন্দী, দোহাই দিচ্ছি, সোঁটা দিয়ে গুঁতা মারিস না। জানে না মারলে, আমের কিরা খেয়ে নানাকে বলব তোর কাছে আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য।’
‘তোর মতো কাপুরুষকে আসি বিয়ে করবো? বিলাতি বিটেল, তুই আমাকে কী পেয়েছিস? বুঝেছিস সুন্দর চামড়া দেখে তোর প্রেমে মজে হাটু জলে গোসল করব? দাঁড়া, আজ তোকে সত্যি গুঁতিয়ে মারব।’
এমন সময় পিরসাহেব জোহরের নামাজের জন্য যাচ্ছিলেন। সুপিয়ার নানা উনাকে ডাকেননি বিধায় উনি দেখতে এসেছেন হাজি সাহেব সুস্থ আছেন কি না। উনাকে দেখে সুপিয়া মাথায় কাপড় দিয়ে সালাম করে সোঁটা নামিয়ে দূরে সরে বলল, ‘নানাজান হয়তো ফকেরা মালা নিয়ে ব্যস্ত।’
পিরসাহেবকে দেখে সাধুমশাই কেঁদে বললেন, ‘নানা গো, জল্লাদের নানি আমাকে সোঁটা দিয়ে গুঁতিয়ে মারাতে চায়।’
‘তাহির, আম গাছে তুই কী করছিস? নেমে আয়। আর মারবে না। আমি তোকে বলেছিলাম চুরি করলে কব্জি পর্যন্ত কেটে পেলব।’
গাছ থেকে নামতে নামতে তাহির বলল, ‘আমি চুরি করিনি। এই গাছের আম খাওয়ার জন্য ওরা আমাকে উসকিয়েছিল, বলেছিল এই গাছের আম বুলবুলিরাও খায় না। সত্যাসত্য জানার জন্য দুপুরবেলা ওঠেছিলাম। বুলবুলিরা আসেনি কিন্তু ঝকড়া হাতে হৃদনন্দী সত্যি এসেছে।’
‘আম খাসনি তো?’
‘না গো নানা, আমে হাত দেইনি। আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যান নইলে এই ভূতের তাবিজ আমাকে ভূত বানিয়ে কবচে ভরে ডালে বাঁধবে।’ বলে তাহির পিরসাহেবের পিছনে লুকায়।
‘এটা তো ভূতের বৈরী। তার হাউমাউ শুনে আমার পোষ্য ভূতরা এবার গ্রাম ছাড়বে।’ বলে সুপিয়া মুখ বিকৃত করে চলে গেলে পিরসাহেব চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘তোর মা বলেছিল তুই মস্ত মস্তান হয়েছিস। তোর ভয়ে টোলার লোকজন আতঙ্কিত। সুপিয়ার কোঁদায় তুই কাঁদতে শুরু করেছিস। ছি ছি, তোর লজ্জা হয়নি? এই ভয়ঙ্কর কাণ্ডকারখানা মাহীকে বলতে হবে। জয়জয়কারের জন্য এক হুংকারে দুঃসাহসিক অভিযানের বারোটা বাজিয়েছে।’
পিরসাহেব যখন তাহির সাথে কথা বলেন সুপিয়া তখন ডেকে বলল, ‘নানাজানা, হুজুর আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন এবং উনার বিলাতি নাতি উনার গলা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছে।’
নানা দ্রুত বেরিয়ে বলল, ‘উনার কোনো বিলাতি নাতি নেই।’
‘একটা আছে, পুকুর পারে যেয়ে দেখুন।’
‘তোর যন্ত্রণায় যে কী করি? বৈশাখ মাসে তোর ভয়ে জোয়ান বুড়া বাড়ির ধারে পাশে আসে না। যাক, আজ বাড়ি এত নীরব কেন মা’র সাথে তোর নানি চলে গিয়েছি নাকি? রান্না কে করবে, খাব কী, তুই তো ভাত পাকাতে পারিস না?’
‘নামাজ পড়ে আসুন। তারপর দেখব কী কী খেতে পারেন, এবার আমি রাঁধাবাড়া শিখে এসেছি।’
‘খুব ভালো হয়েছে। সমস্যা হলো এখন আর তোকে বিয়ে দিতে পারব না। বিয়ে করাতে হবে।’
‘নানাজান, চাষিরা হালচাষ করে, বিয়ে বসে না। কাপুরুষকে আমি বিয়ে করব না।’
‘আচ্ছা ঠিকাছে। এখন রান্না ঘরে যা, তোর ভয়ে কাজের ঝি আসেনি।’
‘না আসার জন্য আমি ওকে বলেছিলাম।’
‘কী?’
‘নির্ভয়ে মসজিদে যান। আমি মারামারি করি না।’
উনি চলে গেলে সুপিয়া ভিতরে যেয়ে অজু করে নামাজ পড়ে মেঝেতে চাদর বিছিয়ে ভাত তরকারি সাজায়, এমন সময় মনের কানে হৃদনন্দী প্রতিধ্বনিত হলে নিম্নকণ্ঠে কয়েকবার হৃদনন্দী জপে অভিধান খুলে তন্ময় হয়। হঠাৎ নানা ডেকে বললেন, ‘সুপিয়া, ভাত দে।’
উনার দিকে তাকিয়ে সুপিয়া বলল, ‘হৃদয় এবং নন্দিনী শব্দদ্বয়ের মিলন সংক্ষেপ হৃদনন্দী হয় না।’
‘কানে সমস্যা হচ্ছে কিচ্ছু বুঝিনি।’
‘মিনমিনে আমাকে হৃদনন্দী ডেকেছিল। নন্দী নন্দিনীর চেয়ে অর্থের দিক দিয়ে অনেক গরীয়ান। নন্দী, ভক্তির ক্ষমতা রাখে।’
নানা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘নিশ্চয় ভূতের ভয়ের য় এবং নী উহ্য করেছিল। এখন ভাত দে, পেটে ঝাঁগুড়গুড় শব্দ হচ্ছে।’
‘খাবার সাজিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘থাল আরো দুইখান আন।’
‘শুধু আমরা খাব। আরো দুইখান দিয়ে কী করবেন?’
‘হুজুরের সাথে উনার নাতি আসবে।’
‘ভূতের ভায়রা, তওবা তওবা।’
‘তুই ভেবেছিলে মাহী, তাই না? তোর ভয়ে ভণ্ডামি ছেড়ে সে এখন সাধক হয়েছে। যাক, থাল এনে দিয়ে হৃদনন্দীর অর্থ খুঁজে বার কর।’ বলে নানা হাত দিয়ে ইশারা করেন। সুপিয়া থাল এনে দিয়ে পাকঘরে যেয়ে বিড়বিড় করে, ‘ও কেন আমাকে হৃদনন্দী ডাকলো? দয়িতাকে হৃদনন্দী ডাকা যায়। আমি কারো প্রেমিকা হতে চাই না। আমাকে বিরক্ত করার জন্য ভূতের ভায়রা গ্রামে এসেছে। বাগে পেলে তাকে আমি বানরের মত নাচাব।’
এমন সময় পাকঘরের পাশ দিয়ে তাহির হেঁটে যায়। তাকে দেখে সুপিয়া ঝাড়ু হাতে বেরিয়ে বলল, ‘এই দেখ আমার হাতে বাইলের ঝাড়ু। ভূত ঝাড়ার জন্য বানিয়েছি। শহুরে মস্তান, কলঙ্কের ঢোল পিটাবার জন্য কসবায় এসেছিস। দাঁড়া, আজ তোর একদিন কী আমার একদিন।’
তাহির দৌড়ে পালায় এবং নানা বেরিয়ে বললেন, ‘তোর যন্ত্রণায় যে কী করি। তুই আসলে বুলবুলিরাও আনাগোনা বন্ধ করে।’
‘ওরা ওকে চেতিয়েছিল তা আমি জানি, কিন্তু তার মাথায় কি বুদ্ধি নেই? লেখাপড়া করেও জানতে পারেনি মাথায় যে মগজ থাকে। বেআক্কেলের বন্ধু, বুদ্ধির খনির সন্ধান আজো পায়ানি।’
‘তুই কোন কলেজে পড়িস?’
‘নানাজান, ভূতের ভক্তরা আমার নামের তাবিজ ডরায়। ওরা জানে, ঝাড় ফুক শুরু করলে শহর গরম হয়। নাতনি কার দেখতে হবে তো।’
‘ওরে বাসরে! তুই কবে মহিলা সন্ত্রাসী হলে?’
‘নানাজান, ইতররা শয়তানের বেগার। পিরিতির মারিফতি ওরা জানে না। যে বেগার খাটে তার সাথে পিরিত করব কেমনে?’

-সমাপ্ত –

বইর নাম আঠারোটা অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

আত্মাভিমানী | প্রেমোপন্যাস

প্রচ্ছদ

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোৎসবে এসে সুভাসের সাফল্যে তার মা বাবা আনন্দে আপ্লুত। আনন্দাশ্রু মুছে তার বাজু ধরে শান্তগম্ভীর কণ্ঠে বাবা বললেন, ‘আজ তুমি স্বাবলম্বী পুরুষ হয়েছ।’
‘খুশিতে ডগমগ অথবা আহ্লাদে আটখানা হতে চাই না। ব্যস্ত শহরে বসবাস করে আমি বাস্তবিক হয়েছি। নিজে কম খেয়ে কমদামি কাপড় পরে, আমাকে ভালো খাইয়ে ভালো কাপড় পরিয়ে ভরণপোষণ করেছেন। এখন থেকে আমি কম খেয়ে কমদামি কাপড় পরে আপনাদের সেবাযত্ন করব।’ বলে সুভাস হাসার চেষ্টা করে। তার পিঠে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বাবা বললেন, ‘জীবে জীবনীশক্তি দিয়ে আল্লাহ জরায়ূকে জীবন্ত রাখেন। মাতৃগর্ভে অম্লজান নেই তবুও আমরা নশ্বর। দিনে দিনে বেড়ে আমরা আকাশ ছুঁতে পারি না এবং একেশ্বরবাদী হওয়া সস্ত্বেও আমরা ভিন্নমতপোষণকারী বিধায় কেউ যাব স্বর্গে কেউ যাব নরকে।’
সুভাস বিচলিত হয়ে বলল, ‘খুশিতে আত্মহারা হয়ে লোকজন আল্লাহকে ভুলে বগল বাজিয়ে ফাঁড়ায় পড়ে। আপনি অষ্টপ্রহর অন্তর্যামীকে অন্তরে রাখেন। এই জন্য ভক্তির সাথে আপনাকে শ্রদ্ধা করি এবং পদধূলি গায়ে মেখে ধন্য হয়েছি।’
ডান হাত তার কাঁধে রেখে শান্তকণ্ঠে বাবা বললেন, ‘বৌমাকে দেখতে পারব?’
‘বাবা গো, আপনি যা বলেছেন তা বুঝতে না পেরে আমি সত্যি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি।’ বলে সুভাস কপট হাসলে বাবা অবাককণ্ঠে বললেন, ‘এত বছরে বাছবিচার করে তোর মনে কারো প্রতি মায়াটানের উদ্রেক হয়নি জেনে আমি সত্যি আশ্চর্যান্বিত হয়েছি।’
‘সাধ্যসাধনায় সত্যাসত্য জেনেছি, অন্তরাত্মার চেয়ে মা বাবার গুরুত্ব বেশি।’ বলে সুভাস বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলে বাবা উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘ওরে বাপরে। সুভাসের মা, আমার সুভাস কী বলেছে তুমি শোনেছ?’
‘কী বলেছে বুঝিয়ে বললে বোঝব। প্যাঁচকষে জোড়া-তাড়া প্যাঁচালো কথা আমি বুঝি না।’
‘সুভাস বলছে, আমাদেরকে সে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে।’
‘মা বাবা সন্তানের নয়নমণি।’ বলে মা মৃদু হাসলে কান্নার ভান করে সুভাস বলল, ‘আম্মা গো, আমি দেশে ফিরে যেতে চাই।’
‘মিনতি করলেও এবার তোকে রেখে যাব না।’
‘আমার আম্মার মতো এত ভালো আম্মা জগতে আর নেই।’ বলে সুভাস মার কাঁধে মাথা রাখে। আর কথা না বলে বাবা বেরিয়ে ক্যাব থামান। সুভাস দরজা খুলে এবং মা বাবা উঠে বসলে সে উঠে দরজা বন্ধ করে হোটেলের ঠিকানা বলে বসে বলল, ‘আম্মা, পাপিয়াকে সাথে আনলেন না কেন?’
‘চ্যালসি ফ্লাওয়ার শো শেষ হয়েছে তাই আসেনি। নতুন ফুলের বিচি নেওয়ার জন্য আমাকে কানে কানে বলেছে।’
‘নতুন সব ফুলের বিচি আমি কিনে রেখেছি। আমার এক বন্ধু পাপিয়ার জন্য নতুন ড্রেস বানিয়েছে। ওটা দিয়ে সে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল। আচ্ছা আম্মা, সবাই ওকে এত আদর করে কেন?’ বলে সুভাস কপাল কুঁচে মা’র দিকে তাকায়।
‘তা আমি জানব কেমনে? তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর।’ বলে মা মৃদু হেসে বাইরে তাকান। সুভাস কিছু বলতে চাইলে বাবা চোখ পাকিয়ে বললে, ‘আমিও জানি না।’
সুভাস কাঁধ ঝুলিয়ে মা’র দিকে তাকালে মা চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘চোপ, আর একটা কথা না।’
কথার ফাঁকে হোটেলের সামনে ক্যাব থামলে সুভাস বেরিয়ে দরজা খোলে, বাবা বেরিয়ে ভাড়া দিয়ে বললেন, ‘ব্রিকলেইন যেয়ে দেশি খাবার খেতে চাই। শুনেছি শুঁটকিশুরুয়া এবং বেগুনের ভর্তাও মিলে।’
সুভাস কপটহেসে বলল, ‘আব্বা, আজ না আরেক দিন খাব।’
‘পরশু দেশে পৌঁছে গপসপ করার সময় পাড়াপড়শিকে বলতে পারব লণ্ডনি শুঁটকিশুরুয়া জবর মজা।’
‘আব্বা, দেশি শুঁটকি এদেশে নিষিদ্ধ। পেটনামলে সমস্যা হবে।’
‘আর কথা না বলে হোটেলে চলো, নুন মরিচ ছাড়া সিদ্ধ আলু এবং গাজর খাওয়ার জন্য ডাক্তার আমাকে উপদেশ দিয়েছিল।’ বলে বাবা শিউরে ওঠেন। মা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন, ‘ভিতরে চলুন রাত অনেক হয়েছে। কিছু খেলে ভালো হবে।’

আত্মাভিমানীর_গল্প

তারপর পড়ার জন্য অথবা ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুন ….

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

মানসী | প্রেমোপন্যাস

প্রচ্ছদ

আকাশ ঝামরিয়ে পরিবেশ মেঘাচ্ছন্ন হলেও বনবাদাড়ে বসন্তোৎসব। লীলাচঞ্চলে পুষ্পসুবাস। পরিযায়ী পাখিরা তামাবিলে নেমে জলকেলি করছিল। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে তুহিন গুনগুন করে চারপাশে তাকায়। আশেপাশে লোকজন নেই। চোখ বুজে গানে টান দেবে এমন সময় মেঘডম্বর ফেটে তামাবিলে বাজ পড়ে ছ্যাঁৎ করে ওঠলে পাখিরা উড়াউড়ি করে। তুহিন বুকে থু থু দিয়ে মাথা তুলে সামনের বাসার দিকে তাকায়। সালোয়ার কামিজ পরিহিত যুবতী তড়বড় করে গাড়ি থেকে নেমে ভোঁ দৌড়ে বাসায় প্রবেশ করার সাথে সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি অঝােরধারে ঝরে, যেন একবারের বর্ষণে বান ডাকবে। বাজের ডাকে দাঁত কটকট করে তুহিন দৌড় দিতে চেয়ে সামনের বাসার ছাদের দিকে তাকিয়ে নিম্নকন্ঠে বলল, ‘আনন্দময়ী নিশ্চয় অলোকসুন্দরী?’
যুবতী তখন ছাদে ওঠে দু হাত মেলে মনোল্লাসে বৃষ্টিস্নান করছিল। বৃষ্টিসজল উজ্জ্বলাকে দেখে কাব্যরসিকের মতো ভাববোলাকণ্ঠে কবিতাবৃত্তি করে, ‘বৃষ্টিতে ভিজে জেল্লাময়ী পরিপার্শ্বে কামানল জ্বালিয়েছে। বৃষ্টিভেজা বিতনুকে দেখে মিনমিনে মন চনচনে হতে চাইছে। হে বৃষ্টিবিলাসিনী! তোমাকে বাহুতে পাওয়ার জন্য আমি অপেক্ষমাণ। বরণ করলে অবিস্মরণীয় হবে বর্ষণমুখর বাদলসন্ধ্যা।’
মনের কথা মানসীর কানে না পৌঁছে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে অস্পষ্ট হয়। আনন্দোদ্ভাসিত বৃষ্টিবিলাসিনীর প্রাণবন্ত চাঞ্চল্যে তুহিন জীবনীশক্তির সন্ধান পেয়ে আনন্দবিহ্বল হয়ে অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তাকে হাসতে দেখে বাদলবরিষণ ঝরিয়ে নীলিমা মুচকি হাসে। বৃষ্টি এবং বৃষ্টিবিলাসিনীকে ধন্যবাদ বলে দ্রুত নেমে গোসলখানায় প্রবেশ করে এবং মাথা ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে উচ্চকন্ঠে বলল, ‘এক কাপ গরম চা চাই।’
এমন সময় বার কয়েক বিজলি চমকালে আনন্দোচ্ছল যুবতী সন্ত্রস্তা হয়। তুহিন শুকনো কাপড় পরে আস্তেধীরে হেঁটে জানালার পাশে যায় এবং দু হাতে কপাট খুলে চৌকাঠে ঠেক দিয়ে সামনের বাসার দিকে তাকায়। বৃষ্টিবিলাসিনী তখনও বৃষ্টিস্নান করছিল। তুহিন মৃদু হেসে শিউরে হাতে হাত মলে দু হাতে মুখ ঢেকে হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’বলে আরো কয়েকটা হাঁচি দিয়ে ডান হাতে নাক ঘষে এবং আরো হাঁচি আসতে চাইলে কাঁধ ঝুলিয়ে হতাশকণ্ঠে বলল, ‘এ কী সর্বনাশ করেছি?’
চা’র কাপ হাতে বৃদ্ধা প্রবেশ করে বলল, ‘সাহেব, আপনার চা। রাতের রান্না সেরেছি। আমি এখন চলে যাব।’
তুহিন কাপ হাতে নিয়ে সামনের বাসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অমনি অথবা শূন্য হাতে কুটুমবাড়ি গেলে ভূতে কিলায়। অমন করে কেউ অমনি অমনি কথা বলে না। বিমনা হলেও মন অমনি বিক্রীত হয় না। ঢিল না মারলে গাছ থেকে বেল অমনি মাথায় পড়ে না।’
বৃদ্ধা কপাল কুঁচকে বলল, ‘সাহেব, মাঘের মেঘে ভিজে এমনি অমনি কথা বলছেন কেন?’
তুহিন বুক ভরে শ্বাস টেনে বলল, ‘অমৎসর হতে চাই আমি জানি আমার মনে অমতি। বরাবর বারোটায় রোজ বারবেলা শুরু হয়। ঘরেবারে হাঁটি আমি আত্মার আত্মিয়ার দেখা না পাই। মিনমিনে মন যাকে দেখে চনচনে হয়েছে তার সাথে মন বিনিময় করতে চাই।’
‘সাহেব, আজ আপনার কী হয়েছে?’
‘আম্মা!’ বলে চিৎকার করে তুহিন কান পেতে বলল, ‘সোনাসংসার আজাড় হলে মধুর বুলি ভীষণ শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়। পরিবেশ নিস্তব্ধ হলে আমার কলিজাকে ধুনখারা বানিয়ে কে যেন তোলো ধুনে। ধুনুরিকে আমি কখনো দেখিনি। কোথাও শান্তি নেই। শান্তি এবং স্বস্তির জন্য আত্মার আত্মিয়ার পাশে বসে খোশগল্প করতে চাই।’
‘সাহেব, আপনি তো জানেন আপনার সব কথা আমি বুঝি না।’
‘একে একে সবাই অমরাবতী চলে গিয়েছেন। শুধু আমি অবশিষ্ট, নীরবে নিপীড়িত এবং নিষ্পেষিত হওয়ার জন্য।’
‘সাহেব, একটা কথা বলি, দয়া করে রাগবেন না।’
‘ঠিকাছে রাগব না।’
‘বিয়ে করছেন না কেন?’

মানসীর_গল্প

তারপর পড়ার জন্য অথবা ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুন ….

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

পূর্বরাগ | প্রেমোপন্যাস

প্রচ্ছদ

অশ্বত্থতলে বসে এক বৃদ্ধ সুরের মোহে বিমোহিত হয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। ফুরফুরে বাতাসে বটের ঝুরি দুলছিল। একটা নামী দামী মটরগাড়ি রাজপথ দিয়ে আসছিল। অলস দুপুর, দু একটা পাখি ডাকছিল। ভার মনকে হাল্কা করার জন্য বুক ভরে শ্বাস টেনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বৃদ্ধ শান্তকণ্ঠে বললেন, ‘জীবনে কত জনের বন্ধু হলাম। নিজে কুঁজো হয়ে অন্যকে কলাকুশলী করলাম আমি কষ্টে ক্লিষ্ট হলাম। বন্ধুরা পর হল, পর আপন হয় না জানলাম। তবে আমি তা কাউকে খুশি করার জন্য করিনি, নিজের শান্তির জন্য করেছিলাম। যা শুধু অন্তর্যামী জানেন।’
এমন সময় চকমিলানো প্রাসাদের সামনে গাড়ি থামলে দারোয়ান গেট খুলে দেয়। ফটক পেরিয়ে দর-দালানের সামনে গাড়ি থামিয়ে চালক দ্রুত বেরিয়ে পিছনের দরজা খুলে সরে দাঁড়ায়। ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা বেরিয়ে একে অন্যের দিকে গম্ভীর দৃষ্টে তাকান। সামনের সিটে এক সুদর্শন যুবক বসা। বেরোচ্ছে না দেখে ভদ্রলোক তার দিকে তাকান। আয়নায় উনার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে যুবক গড়িমশি করে বেরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ভদ্রলোক গাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করে গম্ভীরকণ্ঠে ডেকে বললেন, ‘শামীম, আজ যাকে দেখেছি ওর সাথে তোর বিয়ে হবে।’
উনি আরো কিছু বলতে চাইলে শামীম ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সাধারণকণ্ঠে বলল, ‘আমি ওকে বিয়ে করব না।’
‘কী বললে?’ ভদ্রলোক গর্জে উঠলে ভদ্রমহিলা চমকে ডানে বাঁয়ে তাকান। চালক ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। দারোয়ান অদৃশ্য বিপদের জন্য প্রস্তুত হয়। ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে শামীম বলল, ‘ওকে আমি বিয়ে করব না। চরিত্রহীনদের সাথে আমি সম্পর্ক রাখি না।’
‘আমার বাড়ি থেকে এখুনি বেরিয়ে যা। আমি তোকে ত্যাজ্য করলাম।’ রাগান্বিতকণ্ঠে বলে ভদ্রলোক হাত দিয়ে ইশারা করেন। আর কথা না বলে শামীম মৃদু হেসে মা’র দিকে তাকায়। মা মুখ ফিরালে আর কারো দিকে না তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস টেনে ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। নিরুপায় এবং অসহায়। কেঁথা বালিশ কিছু নেই, বুকের ইমান তার একমাত্র সম্বল। মুণি ঋষিরা বলেন, সর্বান্তর্যামী আল্লাহ হলেন নির্বান্ধবের বান্ধব এবং ধর্মকর্মে ব্রতীরা সহজে ধর্ম-অর্থ-কামে মোক্ষলাভ করে। আল্লাহে বিশ্বাসী শামীম ‘বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ বলে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তার হাবভাব দেখে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়, গাছগাছালি ঝিম ধরে। পরিপার্শ্বে গম্ভীর্যতা, সন্ধ্যা হয় হয়। পাখিরা নীড়ে ফিরছিল। আস্তেব্যস্তে ঈশান কোণে মেঘ জমে এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি ঝরে, কখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করবে তা কেউ জানে না। শামীম আস্তে ধীরে হাঁটে, তার মুখ বেজার। খোলাকাশের নিচে বৃষ্টিচ্ছায় দাঁড়িয়ে চিন্তার সাগরে ডুব সাঁতার কাঁটে। হঠাৎ আকাশ ভেঙে ঝেঁপে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলে দৌড়ে বাজারের পুকুর পাড়ের হাওয়াখানায় আশ্রয় নেয়। এক পশলা বৃষ্টি ঝরে আস্তেধীরে আকাশ পরিস্কার হয়, প্রকৃতি স্তব্ধ। পুকুর পাড়ের হিজল গাছের ডালে বসা পাখিদের ডাক এবং পাতায় জমা বৃষ্টিজল টাপুরটুপুর করে পুকুরে পড়ে মোহতিমির পরিবেশে ভাবাবেশ সৃষ্টি করে। বাদলসাঁঝে পুকুর জলে বৃষ্টিজল ঝরার শব্দ নীরবতার প্রতিধ্বনির মত হয়, যা শুধু বিরহীরা শুনতে পায় এবং সুরে ছন্দ মিলিয়ে তালে বৈতালে দুঃখের বারমাসী গায়। শামীম তাদের একজন। বৃষ্টির টাপুরটুপুর এবং বাতাসের শন-শন শব্দের সাথে সুর মিলিয়ে গুনগুনি করে। বৃষ্টি থামলে বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরপায়ে হেঁটে রাস্তায় উঠে পথহারা পথিকের মত হাঁটতে শুরু করে। বাস থেমে যাত্রী নামাচ্ছে দেখে দৌড়ে দেবে এমন সময় নাম ধরে কেউ ডেকে বলল, ‘শামীম! কোথায় যাচ্ছিস?’
শামীম পিছু হেঁটে ঘুরে মৃদুহেসে বলল, ‘আরে শাকিল, তুই এখানে কী করছিস? আমি সিলেট যাব।’
‘তোর কী হয়েছে, আজ এত বেজার কেন?’
‘আমার আব্বা আমাকে ত্যাজ্য করেছেন বিধায় নিরুদ্দিষ্ট গন্তব্যের খুঁজে বেরিয়েছি। থাক আমার কথা, ত্রিসন্ধ্যায় আমাদের গ্রামে এসেছিস কেন?’ বলে শামীম আড়চোখে তাকালে শাকিল গম্ভীরকণ্ঠে বলল, ‘তোর সাথে দেখা করার জন্য এসেছিলাম। চাচা তোকে ত্যাজ্য করবেন কেন, বক বক করে আমাকে বোকা বানাতে চাস নাকি?’

পূর্বরাগের_গল্প

তারপর পড়ার জন্য অথবা ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুন ….

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস | গল্প সমগ্র

গল্প_সমগ্র

পড়ার জন্য ই-বই ডাউনলোড করুন ….

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র