পরমাত্মীয় | মহোপন্যাস

প্রচ্ছদ

অধ্যাত্মতত্ত্বে তাত্ত্বিক হতে চেয়ে জেনেছি, অবিনশ্বর প্রাণের প্রভাবে পরমাত্মা প্রাণবন্ত এবং দেহাভ্যন্তরে অধিষ্ঠিত চৈতন্যময় সত্তার নাম আত্মা। ষড়রিপুর বশ্য অন্তরের কুমন্ত্রণায় ব্যক্তিসত্তা বিপর্যস্ত হয়। পরমাত্মীয়রা রক্তের সাথে সম্পৃক্ত। আত্মাদররা অন্যকে অত্যাদর করে। হিংসুকরা আজীবন হিংসাত্মক চিন্তা করে। আত্মসাধনা এবং কায়সাধনায় সংসিদ্ধ পুণ্যাত্মারা প্রশান্ত হয়ে স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করে। এসব প্রমাণসিদ্ধ এবং মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও শৌভিকরা বিশ্বাস করে, তিথ্যমৃতযোগে নব্য কুমারীর রক্ত পানে অমরত্ব লাভ হয়। এমন এক শৌভিকের আবির্ভাব হাওরাঞ্চলে হয়েছিল। জাদুবলে মায়াবন বানিয়ে শবসাধনা করতো। ঐন্দ্রজালিক এবং সম্মোহনবিদ্যায় সে পারর্দশী ছিল। তার আহারবিহারের খবরাখবর কানাকানি থেকে জানাজানি হলে গুরুমন্ত্র শিখতে যেয়ে ভ্রান্তরা নিয়ন্ত্রিত হতো। কোনোএক বৃহস্পতির বারবেলায় গ্রহণে সূর্যের পূর্ণগ্রাস হলে, আকর্ষণশক্তিবিশিষ্ট তেগ কোষ থেকে বার করে শিষ্যদের দিকে তাকিয়ে শৌভিক বলল, ‘শণ্মাসাগে হতাশ্বাস হয়েছিলাম। অবশেষে পূর্ণগ্রাসে পূর্বাভাস পেয়েছি। মাহেন্দ্রক্ষণে নিরঞ্জনার রক্ত পানে অমর হব।’
অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে এক শিষ্য স্বগতোক্তি করে, ‘পঞ্চামৃতে অত্বর মুত্যু হয়। কদ্দিন আগে তুই নুন পান্তা খেয়েছিস বিধায় সত্বর মৃত্যু স্বাদ আস্বাদ করবে।’
হিংস্রদৃষ্টে তাকিয়ে শৌভিক বলল, ‘গুরুমারা বিদ্যা শিখে আমি দক্ষিণায় গুরুকে মৃত্যু উপহার দিয়েছিলাম। তোরা আমার চেলা। চালবাজি করলে অকালমৃত্যু হবে। তোদেরকে বশ করে আমি নিরাপৎসু হয়েছি এবং স্বত্বর অমরত্ব উপভোগ করব।’
‘যদি তুই জানতে, যদি তুই বুঝতে, যদি তুই সত্যাসত্য দেখতে, আমি শপৎ করে বলতে পারব মৃত্যুর জন্য তুই প্রস্তুত থাকতে।’ নিম্নকণ্ঠে বলে শিষ্য মাথা দুলালে শৌভিক চিৎকার করে বলল, ‘যা, নন্দিরগাঁওর নন্দিনীকে নিয়ে আয়। কালক্ষেপে কালান্তর হলে কালান্তক হবে।’
‘নির্যাতক মানুষের নির্যাতনে প্রমাণিত হয়েছে, মানুষত্ব শব্দের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ নেই। অন্যায় অত্যাচার হত্যা ধর্ষণ এসব মানুষকৃত বিধায় অমানুষ শব্দকে হিংস্র জীবরাও প্রত্যাখ্যান করেছে। মনে রাখিস, চাইলেই মৃত্যুকে স্পর্শ করা যায় না তবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া যায়। মৃত্যুর পর যখন কর্মফল ভোগ করব তখন কেউ হায় মাতম করব কেউ পরমানন্দিত হব। মৃত্যুকে আমরা আন্তরিক ভাবে বিশ্বাস করি না এবং অবশেষে বিশ্বাস করেছি, আমরা তখন শ্রেষ্ঠ হব যখন বুঝব আমরা যে সৃষ্ট।’ নিম্নকণ্ঠে বলে আদিষ্ট শিষ্য যখন বেরোয় তখন মৌজার রাখালরা গরু নিয়ে নন্দিরগাঁওর গোঠে যায়। মাসুম নামের রাখাল বটগাছে হেলান দিয়ে বসে বাঁশি বাজায়। মোহনসুরে সম্মোহিত হয়ে নন্দিরগাঁওর জমিদারের মেয়ে দৌড়ে বেরোলে মা চিৎকার করে ডাকেন, ‘মালীহা, দাঁড়া।’
পিছন ফিরে না তাকিয়ে মালীহা দৌড়ে বটতলে যেয়ে মাসুমের মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘তোমার ভালোবাসার জন্য নিরাকুল হয়েছি। বাঁশির সুর আমাকে বশ করেছে। ভালোবেসে বিবশ করো।’
মাসুম পিছু হেঁটে হাসার চেষ্ট করে বলল, ‘আমি এক গরুরাখাল। রাখালি করার জন্য গরু নিয়ে গোঠে এসেছি। ঘাস খেয়ে গরুরা তাজা হলে আমার পাতে ভাত পড়বে।’
‘আমাকে ভালোবাসলে গোঠের গরু কিনে দেব।’
এমন সময় শিষ্য অনুশিষ্যরা তাদেরকে আক্রমণ করে এবং আঁধীঝড়ে পরিবেশ সমাচ্ছন্ন হয়। শিষ্য দৌড়ে যেয়ে মালীহার হাত ধরে মাসুমের দিকে তাকিয়ে ব্যস্তকণ্ঠে বলল, ‘দৌড়ে দিগন্তরপুর যা, চাইলেও আমি তোকে সাহায্য করতে পারব না।’
শিষ্যের দিকে তাকিয়ে মালীহা বলল, ‘তাকে সাহায্য করো নইলে ঘোর অমঙ্গল হবে।’
‘আমি এখন নিয়ন্ত্রিত এবং ওরা আড়ে-হাতে লেগেছে। তোড়-জোড়ে লাভ হবে না। আড়ে-দিঘে দৌড়ালে আমাকেও মেরে ফেলবে। আমাকে বিশ্বাস কর, আমি তোকে সত্যি ভালোবাসি। তোর ভালোবাসার জন্য ভেলকিবাজ হয়েছি। এখন জোরাজুরি করলে অমঙ্গল হবে।’

পরমাত্মীয়ের_গল্প

তারপর পড়ার জন্য অথবা ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুন ….

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র