অবলীলা | সিলেটাঞ্চলের ভাষায় সামাজিক উপন্যাস

সুখপাখি পোষার লাগি ঝাড়র বাঁশ কেটে যে পিঞ্জিরা বানিয়েছিল তার নাম জাকির মিঞা তালুকদার এবং যার জন্য সুখপাখি পোষেছিল তার নাম মোসাম্মাৎ হেনা বেগম। তারপর কিতা হইছিল… প্রেমবতীর প্রেমে পড়ে বিব্রত হওয়ার আগে ভাগ্যের জোরে লন্ডন আইচ্ছিল আর বউর লগে ঝগড়াঝাঁটি না কইরা সুখে শান্তিতে আছে ই কথা সকলে কইন। সকলতা ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও রাতবিরেতে তারে উড়শে কামড়ায় আর চোখ বুজে বাতাসে ভাসন্ত প্রাসাদ বানায়। এক ভোরে ক্যান-ক্যান গলার গানে ঘুম ভাঙলে ধড়-মড় করে উঠে বসে দু হাতে চোখ কচলায়। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে হেনা বিছানা তুলায় ব্যস্ত হলে হাসার চেষ্টা করে জাকির বললো, “কে সে সাহসী যে শীতের সকালে শীতল জলে গোসল করে? আমি অন্তত পারব না। ঠাণ্ডা পানি আমি ডরাই। আমার হাতে পায়ে কামড়ায়।”
“কথ্য কথার কবিতা আপনাকে অতন্ত দক্ষ কবি বানিয়েছে, শুধু একটা সমস্যা হইছে আর তা হইলো বয়লার নষ্ট। বিহানতিবেলা লটরপটর করলে দেওয়ালের লগে ঠেকা খাইয়া দেওলার লাখান ঠেকবায়, না ইবায় না হিবায়।” বলে হেনা মুখ ভেংচি দেয়। যথেষ্ট কষ্টে কাষ্টহাসি হেসে হাত মুখে ধুয়ে বসারঘরে যেয়ে চা নাস্তা খেয়ে মেয়েকে নিয়ে জাকির বেরিয়ে গেলে রাঁধাবাড়ায় হেনা ব্যস্ত। দুপুর বেলা ঘরে ঢুকে ব্যস্তকণ্ঠে ডেকে জাকির বললো, “বউ গো, জলদি চাইরটা ভাত দে, ভুখে পেট কচলাইয়া মাথা ঘুরার।”
“আথারে পাথারে দৌড়িলে পেটর ভুখে মাথা ঘুরে, হারা বিহান কোয়াই আছলায়?” বলে হেনা দাঁত কটমট করলে জাকির কপাল কুঁচকে বললো, “ভাতর কথা কইতেঔ আভাতির লাখান ঝাৎ করি উঠলে কিতার লাগি?”
“ভাত সালান রান্ধা নায় এর লাগি ঝাৎ করি উঠছি, কোনতা করতায়নি?”
“তোরে আমি কিতা করতাম লো? হেই! আইজ ই বেতমিজর লাখান মাতরে কিতার লাগি? তামচা মাইরানো তমিজ হিকাইলিমো।”
“দোকলারে একলা পাইয়া তুমিও আইজ বেশি মাতিলিরায়।”
“ভুখে পেট কচলার আর তাই ক্যাঁচরম্যাচর করের। বেশি মাতলে কিতা করবে?” বলে জাকির মাথা দিয়ে ইশারা করলে হেনা ব্যস্তকণ্ঠে বললো, “সকলতা সকল সময় কওয়া যায় না। অখন দৌড়িয়া বাজারো যাও। আর হুনো! আমি একটু পরে বারে যাইমো, পারলে ভাত সালন রাইন্ধো আমি আইয়া মজায় মজায় খাইমুনে।”
“কিতা কইলে?”
“কিতা কইতাম কিতা? আমার এপয়েন্টমেন্ট আছে, দেরি হইলে সমস্যা হইব।”
“দেখরায়নি তাই কিজাত বেটি বইনছে? জাগা থাকি ঢুলিছ না, আইজ তোর চুল ছিড়তাম।”
“তোমার নানায় পারছইন্না আমার চুল ধরতা আর তুমি আমার লগে বরফুটানি কররায়। বেশি মাতলে পুলিশ ডাকিলিমো।” বলে হেনা চোখ পাকিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায়।
“ও নানি তুমি কোয়াই গো? ইগোর মাত হুইন্না আমার মাথাত ভিতরে কিতা করের। হেই! কে কোয়াই আছবে জলদি আও, ইগোরে আইজ কিলাইলিমো।” বলে জাকির ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে দু হাতে মাথা চেপে ধরে। হেনা মুখ ভেংচিয়ে আড় চোখে তাকিয়ে বললো, “ত্যানাত ধরার সাহস নাই আর তাইন আমারে কিলাইতা। যেতা মনে কয় ওতা, এর লাগি নাইন্নে তোমার কঠাৎ দিতা গুতা।”
“দেখরায়নি, গুণ্ডাইতর লাখান গুণ্ডিয়া মাতের।”
“মাতমুনানি, আমি অখন ছলাকলা হিকছি। নাইন্নে কইতা, জানলে মাইনষে হাপ লইয়া লেখায় আর না জানলে কুইচ্ছা ডরায়। আমি অখন হাপ কুইচ্ছা চিনি।”
“মেনি লো, মাততে মাততে বেশি মাতিলিরে।”
“বেশি মাতলে কিতা করবায়?”
“বেশি গোসা উঠলে কিল মারি চেগা করিলিমো।” জাকির চোখ পাকিয়ে বললে হেনা দাঁত কটমট বললো, “চেত নাই কমজোরর জোয়ানি ক্ষার আর আনামাতি হুতি থাকি করি সকল বায়দি খাস্তা আমার।”
জাকির আঁতকে উঠে বললো, “ইয়া আল্লাহ! ইগোই ইতা কিতা কইলো?”
“কইছি, দাত নাই বাঘর তড়পানি সার, হাচা কথা হুনলে বুকুত পড়ে ঢেকির পাড়।”
“আইজ ইগো অত বাড় বাড়ছে কিতার লাগি বে? হেই! বেশি উদাইলে কিলাইয়া তলপাটনি বানাইলিমো।”
“উদাইতাম কিতা? আমি তোমার লাখান নায়। আমার শরীলো এখনো জোর চেত আছে, তুমি তো এক্কেবারে নিস্তেজ, হউ যে কইন আড়িয়া বাছুরর তিড়িং বিড়িং বড়াই আর আম্বা, বাঘে ঝাপটা মারলে কয় হাম্বা।” বলে হেনা মুখ ভেংচি দিলে জাকির রাগান্বিতকণ্ঠে বললো, “উভা লো! দুমাদুম কিলাইয়া আইজ তোরে বানাইমো দুম্বা।”
হেনা ব্যঙ্গোক্তি করে বললো, “হ্যেঁ, হারাদিন হম্বিতম্বি আর রাইত হইলে আখাম্বা, বিয়ার আগে কইছলায় দিবায় কিন্তু আইজো দিলায় না একছা মলম্বা। মিস্টার মিঞা মুরব্বি, কোনতা কইলে খালি কও খাইতাম আমি মোরব্বা।”
“রম্ভোরু লো, আইজ তোরে কুসুম্ভা খাওয়াইমো, উভা।”

ই-বইর লিংক

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র