কাব্যরসিকা

কবিদের কাব্যিক জীবনকাহিনী

অসাধ্য সাধনযোগ্য হয় সাধ্যসাধনায় এবং সাধনচাতুর্যে দুঃসাধ্য হয় সহজসাধ্য। অকষ্টকল্পনা হলো কল্পনাবিলাসের উৎস এবং অকষ্টবদ্ধ শব্দের অর্থ জানলে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত কেউ হবে না। বিনাচেষ্টায় কিচ্ছু হয় না। সচেষ্টরা সফল হয়। অচেষ্টরা বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করে। স্বভাবে কাব্যিক হলেও কাব্যিকতা সকলে পছন্দ করে না। সত্যাসত্য জেনে সৃজনী সাত্ত্বিক হয়েছে এবং সাহিত্যসাধক নানার সংস্পর্শে থেকে কাব্যকলা শিখেছে। লাবণ্যচঞ্চল পরমা সুন্দরীর চঞ্চলদৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আজো কেউ প্রেমদৃষ্টে তাকিয়ে প্রেম নিবেদন করতে পারেনি, দোরঙা গোলাপ ছুড়ে প্রেমবাণ মারাতো দূরের কথা। সাতপাঁচ ভেবে চ্যাংড়ারাও দূরত্ব বজায় রাখে। ছুটি কাটাবার জন্য দেশে আসার পর অস্বাভাবিকভাবে ভাবভঙ্গি এবং দেহভঙ্গিমা বদলেছে। পূর্বাহ্নে কাব্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে কাব্যিক স্বভাবে শাড়ি পরে কাব্যময় ভঙ্গিমায় বাগানে হাঁটছিল। অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে নানা উচ্চকণ্ঠে বললেন, “কবিকল্পনার রূপলাবণ্যবতী, চটকদার হয়েছে ডাকের সুন্দরী।”
সৃজনী রেগে গজগজ করে দাঁত খিঁচিয়ে বললো, “বিয়ে আরেকখান করতে চাও নাকি?”
“পরিণতবয়সে বিয়ে করলে শেষ পরিণতি ভালো হবে না।” বলে নানা হেসে কুটিপাটি হলে রেগে ফোঁসে হাতে কিছু দিয়ে চোখ পাকিয়ে সৃজনী বললো, “পূর্ণতাপ্রাপ্তির জন্য মুখে বুজে ধুস্তুরী চিবাও।”
“বাপের জন্মে তোরে আর ডাকের সুন্দরী ডাকব না লো সুন্দরী।” বলে নানা দু হাত নেড়ে হাসতে থাকলে রেগেমেগে সৃজনী বললো, “বুড়ো হলেও স্বভাবদোষ যায় না। অবলার সাথে লটরপটর করা অভীকের মজ্জাগত দোষ এবং থুত্থুড়ে হলেও শিরা উপশিরায় রিপুরা হতভম্বের মত দৌড়ে। বোড়ায় বেড় দিলেও বেয়াড়া বুড়া ভড়কে না এবং বুড়োবুড়ি জড়ো হলে মজ্জায় মজ্জায় মিলে আলোকোজ্জ্বল হয়।”
“তা তো অভ‍্যাসমাফিক কার্মকাণ্ড।” বলে নানা কপট হাসলে নানি মাথা দুলিয়ে বললেন, “এটাই সাংসিদ্ধিক অথবা স্বাভাবিক।”
নানার দিকে তাকিয়ে সৃজনী বললো, “বেশবিন্যাসে ভাব এমন, হাতে যেন স্বর্গের চাবি, যখন ইচ্ছা তখন প্রবেশ করতে পারবে। ঠিকাছে, তাই যেন হয়। শুধু এতটকু বলব, একটিবার নিজের ছায়াকে জিজ্ঞেস করো, স্বর্গোপযোগী কি হয়েছ? ছায়া নিরুত্তর থাকার কারণ, স্রষ্টা সরাসরি সৃষ্টির সাথে কথা বলেন না। কষ্টেসৃষ্টে স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করলে স্বর্গ হবে গন্তব্য।”
নানা মৃদুহেসে বললেন, “পাগলের সাথে পাগলামি করলে পাগলে ধাওয়া করে। সকল পাগল স্বর্গে যাবে না, বেশিরভাগ পাগল নামাজ কাজা করে। ছায়াবাজি দেখার জন্য ছায়াতরুর ছায়ে বসে ছায়ার নিগূঢ় রহস্য জেনেছি, ছায়া কখনো বাসি হয় না।”
“আজ নিশ্চয় অপচ্ছায়ার ভর পড়েছে অথবা অশরীরীর ছায়া মাড়িয়েছেন।”
“ভক্তিবলে অন্তর্ভুক্ত হলেও ভুক্তভোগী ভক্তরা বিভক্ত করে, কাব্যের ভর উঠলে লবেজান কবির ভোগের প্রবৃত্তি বাড়ে।”
“খামোখা চিন্তা করে মন সংশয়গ্রস্ত হয়েছে। মাথার কী যে অবস্থা মুখে বলতে পারব না, স্বস্তির সাথে আশ্বস্ত হওয়ার জন্য আমি আমার কামরায় যাচ্ছি।” বলে সৃজনী গায়ের জোরে হেঁটে যায়। নানা ডান হাত উঁচালে নানি যেয়ে বাজু ধরেন। হাঁটতে শুরু করে নানা বললেন, “কখন যে মাটির দেহ নিথর হবে জানি না। সময়ের সাগর পারি দেওয়ার সময় হয়েছে। পারানি এখনো জোগাড় করতে পারিনি। আমাদের সাথে আমাদের সংসার বিলীয়মান হবে।”
“তা তো স্বাভাবিক। জানেন, আমার মন বেজার হলে মুখ ভেংচিয়ে বলে, তুমি অনুপ্ত নও।” বলে নানি সামনে তাকালে নানা অবাককন্ঠে বললেন, “এত শব্দ কোথায় যে পায়? ভেবে আমি তজ্জব হই।”
“ওর সাথে গল্পগুজব করলে আমার মগজ প্রায় বিকল হয়। আমরা যা বইয়ে পড়তাম তা বাস্তবে চর্চা করে।”
“তুমি ঠিক বলেছ। সৃজনী আসলে কাব্যগুণসমন্বিত কল্পনাবিলাসিনী। ওর মাঝে কাব্যমাধুর্য আছে, কল্পনায় আছে প্রবল শক্তি। ভাবজগতের ভাবিনী। কাব্যজগতের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। অভিধান পড়ে আমার মগজ ফেনা হয়, দিবাতন চিন্তা করে জুতসই শব্দ খুঁজে বার করি। ওর অভাবনীয় ভাবপ্রকাশ এবং ভাববাচ্যে আমি সত্যি সম্মোহিত হই। চমৎকার শব্দ ব্যবহারে চমৎকৃত করে।”
“থতমত খেয়ে আমি প্রায় বিস্ময়বিকল, আর বিস্মিত করলে বিমূঢ় হয়ে ভিরমি খাব।” বলে নানি কাঁধ ঝুলিয়ে নানার মুখের দিকে তাকালে নানা মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বললেন, “চলো, চেতিয়ে আজ ওকে বিস্ময়ান্বিত করব।”
“এখন চেতালে ভিমরুলের চাকে ঢিল মেরে খামোখা কাটা গায়ে নুন ছিটাবে।”

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

প্রেমোপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | সামাজিক উপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন

অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস

পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

অনলাইন পড়ার জন্য অথবা ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুন…..

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন

সত্য প্রেম

কিংবদন্তি প্রেমের গল্প

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, রমণে রমণীয় হয় রমণী এবং রত্নশিল্পীর কলাকৌশলে নীল পাথর হয় নীলকান্তমণি। কিংবদন্তি হলেও রত্নবনিকরা বিশ্বাস করে এবং বাতাসে কানাঘুষো, নীলগিরির গুপ্ত গুহায় সংগুপ্ত নবরত্ন আছে। তা শুনে কেউ আষাঢ়ে গল্প আর কেউ বলে কোটারি যেমন কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে পারে তদ্রূপ নীলগিরিতেও রত্নের খনি থাকতে পারে, এর মানে সত্যাসত্য জানার জন্য সন্ধানী হলে প্রকৃত তথ্য এবং রত্নের সন্ধান মিলবে। যেমন, অনুধ্যানে আত্মান্বেষীরা আত্মদর্শন করে এবং পরমসত্যান্বেষণে সত্যান্বেষীরা চিন্ময় হয়। তত্ত্বানুসন্ধানে সমাজতাত্ত্বিক না হতে পারলেও মনস্তাত্ত্বিক অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক হওয়া যায় এবং আপখোরাকির জন্য স্বার্থান্বেষীরা তক্কেতক্কে ঘোরায়। এমন এক অন্বেষক জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানের অলোক-সুন্দরী উপস্থাপিকার কণ্ঠহারের মধ্যমণি দেখে নবরত্নের অন্বেষক হয়। তার নাম আনীল। বই অভিধান ঘেঁটে নবরত্নের নাম জানলেও নিশ্চিত হতে পারেনি, নীলাচলের নীলগিরি না ওড়িশার নীলগিরিতে তা লুক্কায়িত। গূঢ়তত্ত্ব জানার জন্য উপস্থাপিকার সাথে তথ্য লেনদেন করতে যেয়ে আপাতদৃষ্টে ভালোবাসার সূত্রপাত হয়। তথ্য চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, স্থিরচিত্তে সিদ্ধান্ত করে অভিযাত্রী বেশে বেরিয়ে দেশের নিগূঢ়তম প্রদেশে প্রবেশ করে ব্যস্ততার মিছিলে মিশে অদৃশ্য হলে তার অপেক্ষায় উপস্থাপিকা অপেক্ষিত হয়। বিশ বাইশ বছর পর ভরদুপুরে নীলা নামক যুবতীর মুখোমুখি হলে উদ্ভট কাণ্ড ঘটে। ভয়বিস্ময়ে ভিরমি খেয়ে নীলা এলিয়ে পড়লে আনীল চোখ বুজে অগ্নিমন্ত্র জপে বাতাসে হাত বোলায়। তার হাতের ছায়া মুখের উপর পড়লে চোখ মেলে তার মাথার উপর সূর্যকে দেখে নীলা চিৎকার করে। লোকজন জড়ো হলে নিলীয়মান আনীলের কণ্ঠ নীলার কানে প্রতিধ্বনিত হয়, “নভোনীল শাড়ি পরে নীলা হয়েছ তুমি নীলিমা হতে পারনি। আনীলে নীল মিলে নীলিমা হলেও নীলাঞ্জনাকে নীলা ডাকা যায় না। অলোক-সুন্দরীর নয়ন নীল হলে ওকে নীলনয়না না ডেকে নীলা ডাকা মানানসই।”
বিস্মায়াভিভূত নীলার জন্ম নীলাচল, লেখাপড়ার জন্য সিলেট এসেছে। অনিল নামক যুবকের সাথে চোখাচোখি হলে তার বন্ধুরা ইয়ারকি করে বলে, নীলাকে তুই পাবে না। নীলাকে পেতে হলে আনীল হতে হবে। বন্ধুদের ব্যঙ্গোক্তি শুনে অনিলের মন টলে। অসহায়ের মত নীলার দিকে তাকিয়ে বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সাদরে দাদি তাকে অনিল ডাকেন। আনীল ডাকার জন্য কত মিনতি করেছে কিন্তু দাদি তাকে অনিল নামেই ডাকেন। নীলনয়ানারা নাকি কুহকিনী। নীলনয়নাদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য তাকে আদেশ করেছেন। নীলা আড়চোখে তাকালে সে চোখ বুজে শিউরে উঠে এবং তার কানে আদেশাজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হয়। তো যাক, গ্রীষ্মের ছুটিতে দাদা দাদিকে দেখার জন্য গ্রামে পৌঁছে পরিবেশ এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঐতিহাসিক ভদ্রলোক সাজে। ফজরের নামাজ পড়ে জানালা খুলে পরিপার্শ্বে তাকিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। সূর্যতাপে কোয়াশা বাষ্প হয়ে আস্তেধীরে পরিবেশ পরিষ্কার হয়। বারোমাসি বড়ুইর ডালে নতুন পাতা গজিয়েছে। শিশিরধৌত ফুল কুঁড়িরা শীতল বাতাসের স্পর্শে ফুরফুরে হয়। হিজলডালে বসে পাখিরা ভোরাই গায়। টোনাটুনির টুনটুন ভোরকে প্রাণবন্ত করে। হঠাৎ ছোট্ট পাখি তার সামন দিয়ে উড়ে যায়। দেখতে সোনা চড়াইর মত। টুনটুনি ভেবে চকিত হলেও পরক্ষণে অত্যাশ্চর্য হয়। ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে দ্রুত দরজা খুলে ঘর থেকে বেরোয়। সাতসকালে হন্যের মত হাঁটতে দেখে দাদি হেঁকে বললেন, “অনিল, কোথায় যাচ্ছিস? পাকঘরে আয়, আমার সাথে নাস্তা খাবে।”
“জি দাদিজান আসছি।” বলে অনিল দৌড়ে পাকঘরে যেয়ে বললো, “দাদিজান, আমাদের গ্রামে নুরি আসলো কোথা থেকে?”
“পূবের বাড়ির নুরির কথা বলছিস নাকি? তোকে দেখার জন্য এসেছে হয়তো। তোর পছন্দ হলে এখুনি বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করব।”
“ইয়া আল্লাহ আমাকে তরাও, বোকার মত বকবক করে আজ আমি বিপাকে পড়েছি।”

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

সত্য প্রেম

ভালোবাসার গল্প | প্রেমোপন্যাস | আধুনিক প্রেমের উপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন

মানসী

মনঃকল্পিত ভালোবাসার গল্প

আকাশ ঝামরিয়ে পরিবেশ মেঘাচ্ছন্ন হলেও বনবাদাড়ে বসন্তোৎসব। লীলাচঞ্চলে পুষ্পসুবাস। পরিযায়ী পাখিরা তামাবিলে নেমে জলকেলি করছিল। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে তুহিন গুনগুন করে চারপাশে তাকাচ্ছিল। আশেপাশে লোকজন নেই। চোখ বুজে গানে টান দেবে এমন সময় মেঘডম্বর ফেটে তামাবিলে বাজ পড়ে ছ্যাঁৎ করে উঠলে পাখিরা উড়াউড়ি করে। তুহিন বুকে থু থু দিয়ে মাথা তুলে সামনের বাসার দিকে তাকায়। সালোয়ার কামিজ পরিহিত যুবতী তড়বড় করে গাড়ি থেকে নেমে ভোঁ দৌড়ে বাসায় প্রবেশ করার সাথে সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি অঝোরধারে ঝরে, যেন একবারের বর্ষণে বান ডাকবে। ঠাঠার ডরে দাঁত কটকট করে তুহিন দৌড় দিতে চেয়ে সামনের বাসার ছাদের দিকে তাকিয়ে নিম্নকন্ঠে বললো, “বৃষ্টিবিলাসিনী নিশ্চয় অলোকসুন্দরী?”
যুবতী তখন ছাদে উঠে দু হাত মেলে মনোল্লাসে বৃষ্টিস্নান করছিল। বৃষ্টিসজল উজ্জ্বলাকে দেখে কাব্যরসিকের মতো ভাববোলাকণ্ঠে কবিতাবৃত্তি করে…
“বৃষ্টিতে ভিজে জেল্লাময়ী পরিপার্শ্বে কামানল জ্বালিয়েছে। বৃষ্টিভেজা বিতনুকে দেখে মিনমিনে মন চনচনে হতে চাইছে। হে বৃষ্টিবিলাসিনী! তোমাকে বাহুতে পাওয়ার জন্য আমি অপেক্ষমাণ। বরণ করলে অবিস্মরণীয় হবে বর্ষণমুখর বাদলসন্ধ্যা।”
তার মনের কথা মানসীর কানে না পৌঁছে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে অস্পষ্ট হয়। আনন্দোদ্ভাসিত বৃষ্টিবিলাসিনীর প্রাণবন্ত চাঞ্চল্যে তুহিন জীবনীশক্তির সন্ধান পেয়ে আনন্দবিহ্বল হয়ে অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। অবিরলপাতে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করলে বৃষ্টি এবং বৃষ্টিবিলাসিনীকে ধন্যবাদ বলে সে দ্রুত নেমে গোসলখানায় প্রবেশ করে এবং মাথা ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে নিম্নকন্ঠে বললো, “আটানব্বই টাকায় আটান্নটা ঘোঁটনকাঠি কিনেছিলাম, আটাত্তরটা বরাদ্দ করলে আঠাকাঠিতে ঠাঠা পড়েছিল। এখন ঠাঠা গরম চায় চুমুক দিতে হবে নইলে সারারাত দাঁত কটকট করবে।”
এমন সময় বার কয়েক বিজলি চমকালে আনন্দোচ্ছল যুবতী সন্ত্রস্তা হয়। তুহিন শুকনো কাপড় পরে আস্তেধীরে হেঁটে জানালার পাশে যায় এবং দু হাতে কপাট খুলে চৌকাঠে ঠেক দিয়ে সামনের বাসার দিকে তাকায়। বৃষ্টিবিলাসিনী তখনও বৃষ্টিস্নান করছিল। তুহিন মৃদু হেসে শিউরে হাতে হাত মলে দু হাতে মুখ ঢেকে হাঁচি দিয়ে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে আরো কয়েকটা হাঁচি দিয়ে ডান হাতে নাক ঘষে এবং আরো হাঁচি আসতে চাইলে কাঁধ ঝুলিয়ে হতাশকণ্ঠে বললো, “এ কী সর্বনাশ করেছি?”
চা’র কাপ হাতে বৃদ্ধা প্রবেশ করে বললো, “সাহেব, আপনার চা। রাতের রান্না সেরেছি। আমি এখন চলে যাব।”
কাপ হাতে নিয়ে সামনের বাসার দিকে তাকিয়ে তুহিন বললো, “অমনি অথবা শূন্য হাতে কুটুমবাড়ি গেলে ভূতে কিলায়। অমন করে কেউ অমনি অমনি কথা বলে না। বিমনা হলেও মন অমনি বিক্রীত হয় না। ঢিল না মারলে গাছ থেকে বেল অমনি মাথায় পড়ে না।”
বৃদ্ধা কপাল কুঁচকে বললো, “সাহেব, মাঘের মেঘে ভিজে এমনি অমনি কথা বলছেন কেন?”
তুহিন বুক ভরে শ্বাস টেনে বললো, “অমৎসর হতে চাই আমি জানি আমার মনে অমতি। বরাবর বারোটায় রোজ বারবেলা শুরু হয়। ঘরেবারে হাঁটি আমি আত্মার আত্মিয়ার দেখা না পাই। মিনমিনে মন যাকে দেখে চনচনে হয়েছে তার সাথে মন বিনিময় করতে চাই।”
“সাহেব, আজ আপনার কী হয়েছে?”
“আম্মা!” বলে চিৎকার করে তুহিন কান পেতে বললো, “সোনাসংসার আজাড় হলে মধুর বুলি ভীষণ শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়। পরিবেশ নিস্তব্ধ হলে আমার কলিজাকে ধুনখারা বানিয়ে কে যেন তুলা ধুনে। ধুনুরিকে আমি কখনো দেখিনি। কোথাও শান্তি নেই। শান্তি এবং স্বস্তির জন্য আত্মার আত্মিয়ার পাশে বসে খোশগল্প করতে চাই।”
“সাহেব, আপনি জানেন আপনার সব কথা আমি বুঝি না।”
“একে একে সবাই অমরাবতী চলে গিয়েছেন। শুধু আমি অবশিষ্ট, নীরবে নিপীড়িত এবং নিষ্পেষিত হওয়ার জন্য।”
“সাহেব, একটা কথা বলি, দয়া করে রাগবেন না।”
“ঠিকাছে রাগব না।”
“বিয়ে করছেন না কেন?”
“অকালে আমার অর্ধাঙ্গিনী মরবে, আমি মরব না। এখন সকলাসকাল বাড়িঘরে যাও, বাঁচলে কাল সকালে দেখা হবে।” বলে তুহিন চা’য় চুমুক দিয়ে মাথা দিয়ে ইশারা করে। আর কথা না বলে বৃদ্ধা বিদায় হয়। চা পান করে তুহিন আস্তেধীরে হেঁটে প্রতিটি কামরা দেখে দরজা জানালা বন্ধ করে বসারঘরে যায়। ল্যাপটপ এবং ইর্ন্টানেট ওন করে জানালার পাশে যেয়ে সামনের বাসার দিকে তাকায়। মেঘ কেটে আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। ছাদে কেউ নেই। পরিবেশ নিস্তব্ধ। আশেপাশে দোকানপাট নেই। কিছুর প্রয়োজন হলে শহরে যেতে হয়। বাসা দুটি শহরের এক প্রান্তে। লোকজন তেমন আনাগোনা করে না। বৃদ্ধা দুপুর এসে রান্নাবান্না এবং ঝাড়পোঁছ করে সূর্য ডুবার আগে চলে যায়। বিলম্ব হলে তুহিন দিয়ে আসে। আজ সে কোথাও যায়নি বিধায় বৃদ্ধাকে একা যেতে হয়েছে। সাধারণত এই সময় সে বাইরে থাকে। বৃষ্টিবিলাসিনীকে আজ প্রথমবারের মত দেখেছে। সম্ভবত ভাড়াটে বদলে নতুন ভাড়াটে এসেছে। তার সাথে এখনো পরিচয় হয়নি। সেও গায়ে পড়ে ভাব জমাতে চায় না। বৃষ্টিবিলাসিনীকে দেখে তার মনেরাকাশে আশার বিজলি চমকে মুচকি হাসিকে স্পষ্ট করেছে। চেয়ার টেনে বসে পিয়ানো বাজিয়ে গুনগুন করে…

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

ভালোবাসার গল্প | প্রেমোপন্যাস | আধুনিক প্রেমের উপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন

পূর্বরাগ

ভাবগম্ভীর ভালোবাসার গল্প

অশ্বত্থতলে বসে এক বৃদ্ধ সুরের মোহে বিমোহিত হয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। ফুরফুরে বাতাসে বটের ঝুরি দুলছিল। একটা নামী দামী মটরগাড়ি রাজপথ দিয়ে আসছিল। অলস দুপুর, দু একটা পাখি ডাকছিল। ভার মনকে হাল্কা করার জন্য বুক ভরে শ্বাস টেনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বৃদ্ধ শান্তকণ্ঠে বললেন, “জীবনে কত জনের বন্ধু হলাম। নিজে কুঁজো হয়ে অন্যকে কলাকুশলী করলাম আমি কষ্টে ক্লিষ্ট হলাম। বন্ধুরা পর হল, পর আপন হয় না জানলাম। তবে আমি তা কাউকে খুশি করার জন্য করিনি, নিজের শান্তির জন্য করেছিলাম। যা শুধু অন্তর্যামী জানেন।”
এমন সময় চকমিলানো প্রাসাদের সামনে গাড়ি থামলে দারোয়ান গেট খুলে দেয়। ফটক পেরিয়ে দর-দালানের সামনে গাড়ি থামিয়ে চালক দ্রুত বেরিয়ে পিছনের দরজা খুলে সরে দাঁড়ায়। ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা বেরিয়ে একে অন্যের দিকে গম্ভীর দৃষ্টে তাকান। সামনের সিটে এক সুদর্শন যুবক বসা। বেরোচ্ছে না দেখে ভদ্রলোক তার দিকে তাকান। আয়নায় উনার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে যুবক গড়িমশি করে বেরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ভদ্রলোক গাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করে গম্ভীরকণ্ঠে ডেকে বললেন, “শামীম, আজ যাকে দেখেছি ওর সাথে তোর বিয়ে হবে।”
উনি আরো কিছু বলতে চাইলে শামীম ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সাধারণকণ্ঠে বলল, “আমি ওকে বিয়ে করব না।”
“কী বললে?” ভদ্রলোক গর্জে উঠলে ভদ্রমহিলা চমকে ডানে বাঁয়ে তাকান। চালক ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। দারোয়ান অদৃশ্য বিপদের জন্য প্রস্তুত হয়। ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে শামীম বলল, “ওকে আমি বিয়ে করব না। চরিত্রহীনদের সাথে আমি সম্পর্ক রাখি না।”
“আমার বাড়ি থেকে এখুনি বেরিয়ে যা। আমি তোকে ত্যাজ্য করলাম।” রাগান্বিতকণ্ঠে বলে ভদ্রলোক হাত দিয়ে ইশারা করেন। আর কথা না বলে শামীম মৃদু হেসে মা”র দিকে তাকায়। মা মুখ ফিরালে আর কারো দিকে না তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস টেনে ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। নিরুপায় এবং অসহায়। কেঁথা বালিশ কিছু নেই, বুকের ইমান তার একমাত্র সম্বল। মুণি ঋষিরা বলেন, সর্বান্তর্যামী আল্লাহ হলেন নির্বান্ধবের বান্ধব এবং ধর্মকর্মে ব্রতীরা সহজে ধর্ম-অর্থ-কামে মোক্ষলাভ করে। আল্লাহে বিশ্বাসী শামীম “বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ” বলে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তার হাবভাব দেখে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়, গাছগাছালি ঝিম ধরে। পরিপার্শ্বে গম্ভীর্যতা, সন্ধ্যা হয় হয়। পাখিরা নীড়ে ফিরছিল। আস্তেব্যস্তে ঈশান কোণে মেঘ জমে এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি ঝরে, কখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করবে তা কেউ জানে না। শামীম আস্তে ধীরে হাঁটে, তার মুখ বেজার। খোলাকাশের নিচে বৃষ্টিচ্ছায় দাঁড়িয়ে চিন্তার সাগরে ডুব সাঁতার কাঁটে। হঠাৎ আকাশ ভেঙে ঝেঁপে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলে দৌড়ে বাজারের পুকুর পাড়ের হাওয়াখানায় আশ্রয় নেয়। এক পশলা বৃষ্টি ঝরে আস্তেধীরে আকাশ পরিস্কার হয়, প্রকৃতি স্তব্ধ। পুকুর পাড়ের হিজল গাছের ডালে বসা পাখিদের ডাক এবং পাতায় জমা বৃষ্টিজল টাপুরটুপুর করে পুকুরে পড়ে মোহতিমির পরিবেশে ভাবাবেশ সৃষ্টি করে। বাদলসাঁঝে পুকুর জলে বৃষ্টিজল ঝরার শব্দ নীরবতার প্রতিধ্বনির মত হয়, যা শুধু বিরহীরা শুনতে পায় এবং সুরে ছন্দ মিলিয়ে তালে বৈতালে দুঃখের বারমাসী গায়। শামীম তাদের একজন। বৃষ্টির টাপুরটুপুর এবং বাতাসের শন-শন শব্দের সাথে সুর মিলিয়ে গুনগুনি করে। বৃষ্টি থামলে বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরপায়ে হেঁটে রাস্তায় উঠে পথহারা পথিকের মত হাঁটতে শুরু করে। বাস থেমে যাত্রী নামাচ্ছে দেখে দৌড়ে দেবে এমন সময় নাম ধরে কেউ ডেকে বলল, “শামীম! কোথায় যাচ্ছিস?”
শামীম পিছু হেঁটে ঘুরে মৃদুহেসে বলল, “আরে শাকিল, তুই এখানে কী করছিস? আমি সিলেট যাব।”
“তোর কী হয়েছে, আজ এত বেজার কেন?”
“আমার আব্বা আমাকে ত্যাজ্য করেছেন বিধায় নিরুদ্দিষ্ট গন্তব্যের খুঁজে বেরিয়েছি। থাক আমার কথা, ত্রিসন্ধ্যায় আমাদের গ্রামে এসেছিস কেন?” বলে শামীম আড়চোখে তাকালে শাকিল গম্ভীরকণ্ঠে বলল, “তোর সাথে দেখা করার জন্য এসেছিলাম। চাচা তোকে ত্যাজ্য করবেন কেন, বক বক করে আমাকে বোকা বানাতে চাস নাকি?”
“আমি নিজে এখন বোকাকান্ত হয়েছি, তোকে বোকা বানালে খোকাবাবু আমাকে নাকানিচুবানি খাওয়াবে। যাক, ভাবীর খবর কী, খোকাবাবু এখন কত বড় হয়েছে? অনেকদিন হয় খোকাবাবুকে দেখিনি। অনেক বড় হয়েছে তাই না?” বলে শামীম মৃদু হাসলে শাকিল চিন্তিতকণ্ঠে বলল, “আজ এমন করে কথা বলছিস কেন?”
“আমি এখন পথের পাঁচালী। ঘর নেই গন্তব্য নেই, যেদিকে মন যেতে চাইবে সেদিকে যাব। তুই চলে যা।” বলে শামীম হাঁটতে শুরু করে।

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

প্রেমোপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | সামাজিক উপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন