হাজিবাবা

আত্মসাধকের সার্থক ভালোবাসার গল্প

একমাত্র সন্তানরা নাকি শান্তশিষ্ট, বিধায় বিশিষ্ট হওয়ার জন্য হৃদয় ইংলিশ মাধ্যমে লেখাপড়া করছে। বন্ধুরা তাকে অনেক নামে ডাকে। কেউ ডাকে রিক, কেউ ডাকে রিকি, কেউ ডাকে রক আবার কেউ ডাকে রকি। সহপাঠীরা তাকে সহ্য করতে পারে না এবং সে ও খামোখা ভাঁড়ামি করে। যাইহোক, গ্রীষ্মের ছুটি শেষে ইউনির সামনে ফষ্টি-নষ্টি করছিল। হঠাৎ ফ্যাশনসম্মত রূপলাবণ্যবতী ছাত্রীর মুখোমুখি হলে নিজেকে সামলিয়ে হৃদয় বললো, “I am very sorry, please forgive me.”
উত্ত্যক্ত ছাত্রী অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে পাশ কেটে চলে যেতে চাইলে ডান হাত প্রসারিত করে হৃদয় বললো, “Tell me your pet name and I will let you know mine.”
“ইস!” বলে ছাত্রী বিরক্তি প্রকাশ করে থমকে দাঁড়ায় এবং কপাল কুঁচকে তাকিয়ে স্বগতোক্তি করে, “এলোপাথাড়ি দৌড়ে এঁড়ে লোকের খপ্পড়ে পড়লাম কেমনে? জাতে উঠার জন্য এককালীন লোকটা জাতিচ্যুত এবং সমাজচ্যুত হয়েছে। একগাল খাবারের জন্য নাজানি কী করবে? দূরত্ব বজায় রাখলে জাতিগত প্রভেদ এবং জন্মগত স্বভাব বজায় থাকবে নইলে অজাতকুজাতে বজ্জাত জন্মাবে।”
“You are noble and beautiful but I am wilful, not awful.” বলে হৃদয় অপলকদৃষ্টে তাকালে, গম্ভীরকণ্ঠে ছাত্রী বলল, “নিষ্ণাতে নিষ্পত্তি হলে, নিষ্পেষণ নিষ্প্রয়োজন। নিষ্কারণে নিষ্প্রাণ ভাবপ্রকাশ নিষ্ফল হয়েছে। আমি নিষ্পাপ নই, নিষ্পুণ্য শব্দে আবেগ নিষ্প্রবাহ হয়। তোমার হাবভাব নিষ্পাদক এবং সূর্য এখনো নিষ্প্রভ হয়নি। স্বেচ্ছাচারীকে দিগ্দর্শন করে যথেচ্ছাচারিণী হতে চাই না। লেখাপড়া বিরক্তিকর হলে খোঁড়াখুঁড়ির জন্য মনগড়া খোঁয়াড়ে যাও।”
“I am very sorry, are you talking to me?” সভয়ে বলে হৃদয় চোখ কপালে তুললে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছাত্রী বললো, “নিষ্ঠুর তুমি নিষ্ঠাবান হওয়ার চেষ্টা করলে অন্তরাত্মা সন্তুষ্ট হবে। লোকাচারের অর্থ জানলে সমাজের রীতিনীতি অনুযায়ী সামাজিক প্রথা পালন করতে পারবে এবং সকলের মঙ্গল হবে।”
“I am thunderstruck. Someone please call the doctor!” বলে হৃদয় দুহাতে মাথা চেপে ধরে ডানে বাঁয়ে তাকায়।
ছাত্রী মাথা নেড়ে বললো, “প্রবাহিত সময়ের সাথে পাথরের ছায়া নড়ে, চাইলেও আমি অনড় হতে পারব না। নড়েচড়ে সরে দাঁড়ালে তড়বড় করে হেঁটে যাব। নভোনীল শাড়ি পরে নারীরা দৌড়াতে পারে না।”
আরেক ছাত্রী ডেকে বললো, “এই নদী, কী হয়েছে?”
“সুষ্ঠু মাথা নষ্ট করার জন্য ফ্রায়েড রাইস খেয়ে এই লোকটা আমার সাথে ঝগড়াঝাঁটি শুরু করেছে।” বলে নদী মাথা নেড়ে দ্রুত চলে যায়। অন্য ছাত্রীর দিকে তাকিয়ে অবাককণ্ঠে হৃদয় বললো, “Who is she and where is she from?”
“ওরে অবাঙাল, বাংলা শিখে বাঙাল হওয়ার চেষ্টা করলে অন্তত তোর মঙ্গল হবে।”
“নদীর একটা কথাও আমি বোঝিনি। আমার দাদা প্রদাদাকে বকাবকি করেছিল নাকি?”
“শাড়ির আঁচল ধরে জিজ্ঞেস কর যেয়ে।” বলে ছাত্রী দ্রুত চলে গেলে হৃদয় ক্লাসে যায় এবং ছুটির পর সিঁড়িতে বসে গুনগুন করছিল। তাকে বিরক্ত না করে ছাত্রাছাত্রীরা দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত সটকাচ্ছিল। নদী বেরোতে চেয়ে তাকে দেখে চমকে এক পা পিছিয়ে বিড়বিড় করে কিছু পড়ে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় আড়চোখে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে নিম্নকণ্ঠে বললো, “সংস্পর্শ তো দূরের কথা তোমার সংস্রবে আমার সর্বনাশ হবে। সত্বর সংস্ক্রিয়া করলে শান্তি এবং স্বস্তি সংস্থিত হবে। সংস্কৃতি সংস্কারে সংস্কর্তা হলে হয়তো পাশে বসে প্রেমালাপ করব।”
“নদী, দাঁড়াও।” বলে হৃদয় দৌড়ে পাশে গেলে নদী চমকে বুকে থুতু দিয়ে বললো, “হঠাৎ ঠাঠা পড়ে আটানব্বই সের আটার ভুষ্টিনাশ করেছে।”
“আমাকে বাংলা শিখাবে? আমি বাঙাল হতে চাই।”
“তুমি অবাঙাল নাকি?”
“Unfortunately I was made in Bangladesh.” বলে হৃদয় বোকার মত হাসে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে নদী বললো, “অধশ্চৌর এবং সিঁধকাঠির অর্থ কী?”
“শোনেছি জায়ফল বেশি কষা এবং ভল্লুকরাজ মধু পছন্দ করেন।”
“এক খড়িশের বিষে আঠাশটা খাটাশ মরেছিল, বিষবৃক্ষের জড় জাপটে দাঁড়াশ নির্বিষ হয়েছিল, তা কি তুমি জানো?”
“কেউ আমাকে কানেকানে বলেছিল, সালম-মিছরি আনার জন্য বেজির ভাশুর তখন কবিরাজের বাড়ি গিয়েছিল।”
“বোঝেছি, প্রভাবপ্রতিপত্তির জন্য কূটবুদ্ধির প্রয়োগ করতে হবে।” বলে নদী হাঁটতে শুরু করলে, পথরোধ করে হৃদয় বললো, “ছাব্বিশের অর্ধেক ছাপ্পান্ন হলে তিরাশির অর্ধার্ধ কত?”
“আমার সম্মুখ থেকে সরে দাঁড়াও, তোমার ছায়ায় পাড়া মারলে আওসা বেমার হবে।”
“মোটামুটি সঠিক উত্তর হল, সাতাশ দশমিক ছেষট্টি।”
“দশমিক দুইর ভরতুকি কে করবে?” বলে নদী মাথা দিয়ে ইশারা করে পাশ কেটে যেতে চায়। কাঁধ ঝুলিয়ে হৃদয় বললো, “নদী, কমপক্ষে অন্তত শরম ভরম শব্দের অর্থ আমি জানি।”
“অধর্ম্য কাজে ধর্মনাশ হয়।”
“আমি অধার্মিক নই। তোমাকে দেখার সাথেসাথে তোমার প্রেমে পড়েছি। কারো প্রেমে পড়লে ধর্মের সর্বনাশ হয় নাকি?”

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

হাজিবাবা

প্রেমোপন্যাস | আ্যধাত্মিক উপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | সামাজিক উপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন

নীলকমল

দুঃসাহসিক ভালোবাসার গল্প

আগামী মাসে দ্বাদশশ্রেণীর পরীক্ষা শুরু হবে। ছাত্র ছাত্রীদের শঙ্কিল মনে বেজায় আতঙ্ক। অনাবশ্যক এবং অত্যাবশ্যক শব্দের অর্থ জেনে ওরা প্রয়োজনে কথা বলে অপ্রয়োজনে একে অন্যকে এড়িয়ে চলে। পাঠানু-রাগী ছাত্র ছাত্রীরা পাঠাগারে বসে পাঠ্যক্রমানুযায়ী পঠন-পাঠনে ব্যস্ত। কলেজাঙ্গনে তাদের দেখা না পেয়ে আস্তেব্যস্তে অন্যরা যেয়ে এককাট্টা হয়। কারো হাতে মিঠা শরবত, কারো হাতে ঠাণ্ডামিঠাই। ইদানীং গায়ে পড়ে তাদের সাথে ভাব জমাতে সবাই মহাব্যস্ত। তা শুধু পরীক্ষা নাম্নী বিপদসংকেত বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলে হয় এবং বরাবরই পরীক্ষাপত্রে শেষ অক্ষর লিখে, কলমের ভাবী কলমিলতা, পুঁথিশালার দুলাভাই চশমাআলা, এসব বলে কটূক্তি করে বিধায় বইপোকারা এবার লাই দিচ্ছে না। কলেজ কামাই করে যারা শিকে পোড়ে ঘুঘু খেয়ে গায়ে মাস লাগিয়েছিল, ওরা একপাশে বসে ভোঁতা বুদ্ধি ধারাবার জন্যে নিদিধ্যাসন করছে। চিন্তার সাগরে থই নেই বিধায় ওরা ঠাঁই পাচ্ছেনা এবং আক্কেলের বালোকাবেলায় বসে ভোঁতা বুদ্ধি ধারাতেও পারছে না।
কয়েক চশমাআলা এক বেঞ্চে বসে ঘি-চমচম চিবাচ্ছিল আর শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল। হঠাৎ কাকতালীয় কণ্ঠস্বর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়, “পরীক্ষাপত্রে প্রশ্নোত্তর লিখতে হবে না, শুধু প্রশ্ন-নম্বর বললে আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার হবে। পরীক্ষা পাশ করলে তোদেরকে আর ভড়কাব না।”
ওরা ঝম্পে উঠে বেঞ্চের পিছনে যেয়ে সভয়ে বললো, “মুহীব, তুই এখানে কী করছিস?”
পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা মল্লের মত তাগড়া মস্তান দাঁড়িয়ে পাছা ঝাড়তে ঝাড়তে উদাসকণ্ঠে বললো, “বই মেললে ছাপারাক্ষরে প্রিয়তমার অবয়ব স্পষ্ট হয়। বিমনা হয়ে চোখ বুজলে, মনশ্চক্ষে মানসীর মুখচ্ছবি দেখি। মনশ্চাঞ্চল্যে বিচঞ্চল হলে, প্রাণোচ্ছল হয়ে খলখল করে হাসে। উদাসদৃষ্টে শূন্য হাতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, মেন্দির রঙ্গে রাঙ্গা প্রেয়সীর হাত ধরে বনবাসে যাচ্ছি।”
একজন সভয়ে বললো, “এসব কীসব বলছিস বুঝিয়ে বল।”
মুহীব বিদ্রূপ হেসে মাথা নেড়ে বললো, “ইউনিভার্সিটির উঠানে তোদের সাথে সাক্ষাৎ না হলে, বাপের জন্মে তোরা আর পরীক্ষার দেয়াল টপকাতে পারবে না।”
“কেন?”
“ভূতপূর্ণিমায় তোদেরকে আমি পাগল বানাব। পাগল হয়ে তোরা ছাগলের সাথে ঢুসা-ঢুসি করবে। গল্পগাছায় হাত পা বেঁধে আমি তোদেরকে দিকদারি দেব।” বলে মুহীব শরীর কাঁপিয়ে হাসলে এক চশমাআলা সভয়ে বললো, “কাগজ কলম থাকলে জলদি দে।”
“পরীক্ষা আগামী মাসে, এখন কাগজ কলম দিয়ে কী করবে?”
“প্রশ্ন-নম্বর লিখে দেব।”
“তা তুই কেমনে করবে?” বলে মুহীব বোয়াল মাছের মত হাঁ করে তাকায়।
“গূঢ়তত্ত্বে তাত্ত্বিক হওয়ার তথ্য জন্মসূত্রে পেয়েছি।” চশমাআলা চশমা ঠিক করে বললে মুহীব হতাশ হয়ে কাঁধ ঝুলিয়ে বললো, “আমি পুরাতাত্ত্বিক হতে চাই না, টুকলি না করে শুধু পরীক্ষায় পাশ করতে চাই।”
“অবশেষে আসল বিষয় তুই বুঝেছিস, এখন বাসায় যেয়ে আদেশ-নির্দেশাদি মেনে পাঠ্যক্রমানুযায়ী পাঠ্যপুস্তক পাঠে অভ্যাস্ত হলে প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করতে বেশি সময় লাগবে না।”
“কালন্দরের মত দোলে দোলে পড়া মুখস্থ করা সত্যি জবর জটিল কাজ।”
“পরীক্ষায় গোল্লা পেলে তোর বাবা তোকে আর মহিষীকে লাঙলে জোড়ে হাল চাষ করাবেন, আঁতেল হতে চাইলে আথালে কাজ করাবেন।”
“প্রশ্নোত্তর মুখস্থে ব্যস্ত হলে প্রিয়তমার বিধুবদন দেখার সুযোগ পাব না, আহ।”
“এক নম্বরে টপকালে ভাব জমিয়ে তোর সাথে পিরিতি করবে।”
“সত্যি বলছিস?”
“কানাঘুষো শোনেছি।”
“তোরা নির্ভয়ে ফুর্তিফার্তা কর, পাঠ্যপুস্তক কিনার জন্য আমি এখন দোকানে যাব।” বলে মুহীব দৌড়ে চলে যায়। পরদিন থেকে তার ছায়া দেখলে চশমাআলারা দৌড়ে শিক্ষকের পাশে বসে দোলে দোলে পড়া মুখস্থ করে। সে কারো সাথে কথা বলে না, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে। পরীক্ষা শেষ হলে ফলাফল জেনে ওরা গুনগুন করে এবং তাকে দেখলে চুপ হয়ে অন্যদিকে তাকায়। সজনীর বিধুবদন দেখতে না পেয়ে সে বেজার হয়ে চলে গেলে বন্ধু বান্ধবীরা এককাট্টা হয়ে আমর্ষে পরামর্শ করে। গতবছর বান্ধবীদের অপবাদের কারণ বন্দূরা বান্দরবন যেতে পারেনি, এবার ওরা সুন্দরবন যেতে চায়। সিলেট থেকে হাঁটাহাঁটি শুরু করলে কমপক্ষে অন্তত মাস খানেক লাগবে। সবাই চিন্তাফন্দি করছিল কিন্তু কারো আগে কেউ কিছু বলছিল না। হঠাৎ এক বান্ধবী বললো, “আমি আমার জীবনেও জলপ্রবাহের শব্দ শুনিনি। ইস! ঝর্ঝরিত জল কী সুন্দর ঝর্ঝর শব্দে আশমান থেকে গড়িয়ে পড়ে।”
আরেক বান্ধবী কপালে আঘাত করে বললো, “হায় রে আমার পুড়া কপাল, এক যুগ লেখাপড়া করেও জলপ্রবাহের অর্থ জানে না, মন চাইছে কিলিয়ে দুই চোখে নির্ঝর ঝরনা প্রবাহিত করি।”
এমন সময় বাতাসে কবিতা আবৃত্তি ভাসে, “তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কাছে আসো। বুকে পেতে দেব ফুলশয্যা। ওগো মোর প্রেয়সী।”

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

রোমাঞ্চকাহিনী | রহস্যউপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | ভালোবাসার গল্প

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন