ধাধসপুরে বারবেলা

ভূতাবিষ্ট ভালোবাসার গল্প

অসত্য জেনেও বাল্যকালে দত্যিদানো এবং রাক্ষসখোক্কসের গল্প পড়েছি। বয়সের সাথে বাস্তবিক হয়ে জেনেছি, বরাবর বারোটায় ভূত পেতনীর সাথে কেউ দেখা করতে চায় না এবং পুরাণ কথা পুনরায় লিখে নামের আগে নকুলে লাগাতে চায় না, তাই আমি সমন্বয়সাধনের জন্য কল্পগল্প লিখে গাল্পিক হতে চাই। সমস্যা হলো, সামঞ্জস্যসাধন ল্যাংড়ার হাতে লাঠি নয় এবং মেঘালয়ের তরাই থেকে কোঁদাকুঁদি করলে কুঁদরুবন থেকে কুঁদুলি বেরোবে এবং বেশি কোঁতাকুঁতি করলে ভয়ে কুঁজড়া হতে হবে, এসব ভেবে ভাবুক হওয়ার দুর্ভাবনা বাদ দিয়ে হাঁটাচলা করছিলাম। ঠিক মাথার উপর সূর্য আসার সাথে সাথে রৌদ্রাভাবে আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পরিবেশ ঝঞ্ঝাসমাকুল হয়। প্রখর রৌদ্রতেজে দূরের দৃশ্যপটে মাটি থেকে ভাপ উঠতে শুরু করে এবং ঘনঘন বিজলি চমকে কড়কড় কড়াৎ শব্দে বাজ ফেটে ভূমিকম্পবলয় থেকে খপুষ্পরা বেরিয়ে অস্পষ্টালোকে লুকালে শুরু হয় ধাধসপুরে বারবেলা। অবিশ্বাস্য ভাবে ভূতাবির্ভাব হলে ভূতার্ত লোকদের অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপে পরিবেশ অস্বাভাবিক হয়। আরশোলা পাখির মত ওড়ে, নেংটি ইঁদুররা নির্ভয়ে দৌড়াদৌড়ি করে এবং বনগহন থেকে বন্যকুকুর বেরোলে পরিবেশ শ্বাপদসংকুল হয়।
ওসব দেখে ডরে-ভয়ে যোজ্য ব্যঞ্জনবর্ণ চিহ্ন সরিয়ে ভোগ্যকে ভোগ বানিয়ে আমি বিপাকে পড়েছিলাম। তখন খালি পায়ের নিচে ঝুরো মাটি আর মাথার উপর ছিল বটের ঝুরি, মানে এক্কেবারে বরাবার বারোটায় জারিজুরির সাড়ে বারোটা বেজেছিল। ভোজপুরি ভূতরা খোরপোশের জন্য শোরগোল করলে ওঝারা যে শোল মাছ পুড়িয়ে ভোগ দেয় তা জানলে অভব্যকে নীচকুলোদ্ভব করতাম। না জানার দরুন ভোজবাজির তাবিজ আনার জন্য আমি যখন ওঝার বাড়ি যাই তখন কলেজের বাগানে এক জোড়া শ্যামা আধার খাওয়ায় ব্যস্ত। হঠাৎ অলোক থেকে দাঁড়কাক বেরিয়ে একটাকে ছোঁ মেরে ধরতে চায়। ছোবল থেকে ফসকে আড়ংবাড়ং করে উড়ে অন্যটার সামনে দিয়ে গেলে দুটা মিলে কাক ধাওয়া করে বাতাসে অদৃশ্য হয়। পরিস্থিতি এবং পরিবেশে অস্থিরতা অনুভব করে পেশিবহুল ওজস্বী যুবক ডানে বাঁয়ে নিম্নকণ্ঠে কথা বলে, “জিনের তৈরি পাতলুন পিন্ধে জয়শীল জোয়ান ঘোড়ার জিনে বসে যুযুৎসা জিনের মুখোমুখি হলে, রক্ত শুকিয়ে অজিন কালাজিন হয়।”
এমন সময় অলোকসুন্দরী ছাত্রী কলেজ থেকে বেরিয়ে ডাকাডাকি করে…
“আয়মান ভাই! তুমি কোথায়?”
“কী হয়েছে, হাঁকাহাঁকি করছিস কেন?”
“আমার ভয় হচ্ছে। দৌড়ে আসো।”
“তুই বাড়ি যা আমি পরে যাব।”
“তুমি এখন কোথায় যাবে?” বলে সরসী অগ্রসর হতে চেয়ে থমকে দাঁড়ায়। কিছু ওর পথরোধ করে। অত্যাশ্চর্য হয়ে হাতড়ে অদৃশ্য দেয়ালের মত কিছু অনুভব করে পিছু হেঁটে চালিয়ে চলে যায়। আয়মান তখন নিম্নকণ্ঠে সুরা নাস পড়ে। ফকিরামালা হাতে অদ্ভুতদর্শন বৃদ্ধ তার নিকটবর্তী হয়ে গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, “অবিশ্বাস্য হলেও দত্যিদানো আছে। সুরা আল জিনের অনুবাদ পড়লে সত্যাসত্য জানতে পারবে। নির্ধূম আগুনে সৃষ্ট গুপ্ত সত্তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে বসবাস করে। তাদের মাঝে আস্তিক নাস্তিক পাষাণ এবং পাষণ্ড আছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়ে অতুষ্ণ বায়ূতে পরিণত আগুন থেকে আবুল জিন্নাত সামূমকে সৃষ্টি করে কামনা জানতে চাইলে, সে মৃত্যুর আগে পুনর্যৌবন এবং অন্যদের জন্য অদৃশ্য হতে চেয়েছিল। সর্বকামনাপূরণকারী আল্লাহ তার কামনা পূরণ করেছিলেন। পাঁচ প্রজাতের মধ্যে জিন বা জিন্নাত হলো এক বিশেষ প্রজাতি। আমির মানুষের সাথে থাকে। আরওয়াহ মানুষের সামনে আসতে পারে। শয়তান হলো অবাধ্য। ইফরীত্ব শয়তানের চেয়ে বিপজ্জনক। ইফরীত্ব শব্দের অর্থ ভূত। জিনদের দেহ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এবং বেশিরভাগ সময় ওরা সর্পাকৃতিতে চলাফেরা করে। সজ্ঞানে যা জেনেছি এবং বাস্তবে যা অভিজ্ঞতা করেছি তা তোমাকে বলব। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশ্লেষণ করলে, জ্ঞাতব্য জেনে অভিজ্ঞতা অর্জন করলে তুমি জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ হবে।”
“আপনি বিরক্ত না হলে আমি উপকৃত হব।”
“ধর্মশাস্ত্রে জীবের বল এবং দূর্বলতার বিশ্লেষণ আছে। অপমন্ত্রে মানুষ বশ্য হয় এবং শাস্ত্রমন্ত্রে জিন বশ করা যায়। জিনরা তিনশো বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। জাদুকররা শয়তানোপাসক। ওরা বিশ্বাস করে শয়তানের উপসনায় অমরত্ব লাভ হয়। হারুত এবং মারুত নামক ফেরস্তারা বাবেল শহরের মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিল। জিনের কাছ থেকে জ্যোতিষীরা ভবিষ্যৎ গণনা শিখেছিল। ভবিষ্যদ্বক্তা জিনরা আকাশসীমায় যেয়ে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জানতে পারতো। কোরআন নাযিল হওয়ার পর থেকে ওরা আর আকাশসীমায় যেতে পারে না।”
“বাস্তবিক হওয়ার জন্য উপদিষ্ট হতে চাই।”
“প্রতিহিংসা হলো প্রতিশোধের প্রতিশব্দ। প্রতিশোধের অর্থ হলো, অন্যায়ের প্রত্যুত্তরে অন্যায়কারীর ক্ষতিসাধন। প্রতিহিংসায় আত্মিক শান্তি নষ্ট হয়। ক্ষমায় শান্তি এবং শুদ্ধি লাভ হয়। বুঝেশুঝে আপোস করলে সকলের মঙ্গল হয়। অবুঝের মত আপোস করলে বিপাকে পড়তে হয়। হঠাৎ তোমার মৃত্যু হবে। অন্যরা তোমার সম্পদের মালিক হবে। তোমার সন্তানরা এতিম হবে। তোমার স্ত্রী বিধবা হবে। তোমার কী হবে তা কী কখনো ভেবেছ? হাসরের মাঠে সবাই ব্যতিব্যস্ত থাকব।”
“অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করলে বিশেষজ্ঞ হব।”
“জাদুঘরে পুরাতত্ত্ব বিষয়ক দ্রব্যসম্ভার আছে। অতীতে কী হয়েছে তা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। বর্তমানে কী হচ্ছে তা আমরা অভিজ্ঞতা করছি। ভবিষ্যতে কী হবে তা শুধুমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। জন্ম মৃত্যু আয়ূ সম্মান এবং সম্পদ এসব আল্লাহর আয়ত্তে। ধৈর্যে কার্যসিদ্ধি হয়। সাধ্যসাধনায় সিদ্ধাই হলে লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য সাঙ্গপাঙ্গ সুদ্ধ জুজুবুড়িকে যমের জাঙ্গালে পাঠাতে পারবে।” বলে ফকিরামালা তার হাতে দিয়ে বৃদ্ধ হাঁটতে শুরু করেন।

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

ধাধসপুরে বারবেলা

এডভেঞ্চার উপন্যাস | রোমাঞ্চকাহিনী | রহস্যউপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | সামাজিক উপন্যাস | প্রেমোপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন