অমানী নিশাত | উপন্যাস

অতর্কিতভাবে আকাশ ঝামরিয়ে হাঁড়িয়ামেঘ আর রাঙামেঘের সংঘর্ষে ঘনগর্জন শুরু হলে মেঘতিমিরে পরিবেশ আচ্ছন্ন হয়। এক যুবক মনানন্দে গান গেয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ বাজ ফেটে বিজলি চমকালে, “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বলে সে দৌড় দেয়। অনতিদূরে বাস থেমে দরজা খুলে। নামবে কি না নামবে নিয়ে দুই বান্ধবী দোটানে পড়ে দোনোমনো করে। ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বললো, “তানা-না-না করে ত্বরে নামলে সকলের মঙ্গল হবে।”
“করি কি না করি?” একসাথে বলে বান্ধবীদ্বয় বাস থেকে নেমে আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক তাকায়। চারপাশে আকাশচুম্বি অট্টালিকা তবুও যেন মাথা গুঁজার ঠাঁই কোথাও নেই। এক বান্ধবী বললো, “শাইরা, চল কফি খাব। অনেকদিন হয় গরমাগরম সিঙারা খাইনি।”
“তুই কফি খা আমি পার্কে যেয়ে ঝালমুড়ি খাব।” বলে শাইরা ডানে বাঁয়ে থাকিয়ে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে পার্কে প্রবেশ করলে আকাশ ভেঙে ঝেঁপে বৃষ্টি ঝরে। যেন একেবারের বর্ষণে শহর ডুবাবে। শাইরা দ্রুত হেঁটে গাছের নিচে গেলে যুবক দৌড়ে যেয়ে দু হাতে চুল ঝাড়ে। শাইরা কপাল কুঁচকে তাকালে, যুবক কপট হেসে বললো, “ঠাঠাপড়া মেঘ আমাকে তাড়া করেছে। বাজ ফেটে ঠাঠা পড়েলে আমি ডরাই।”
“আমাকে শুনাচ্ছ কেন, নানীর মত পাথালি কোলে লয়ে অভয় দিতে হবে নাকি?” বলে শাইরা মুখ বিকৃত করে। ওর কথায় কান না দিয়ে যুবক এদিক-ওদিক তাকায়। অনতিদূরে চা’র দোকান দেখে দু হাতে মাথা চেপে ধরে গাছে হেলান দিয়ে বসে মাথা নেড়ে যুবক বললো, “মারধর করলেও এখন আমি চা’র দোকানে যাব না। বাজ ফেটে ঠাঠা আমার মাথায় পড়বে।”
তার কথা শুনে হাসতে শুরু করে শাইরা বললো, “সত্যি ঠাঠাবাজকে ভয় পাও নাকি?”
“ঠাঠাবাজকে আমি ভয় পাই না, আমি তাকে চিনিও না। আপনি তাকে চিনেন নাকি? আমি গুণ্ডামি করি না।”
“এই একটু আগে বলেছ, ঠাঠা পড়ে বাজ ফাটলে আমি ডরাই।”
“ও আচ্ছা। ঠাঠা এবং বাজ দুটাকে আমি ডরাই। একবার সামান্যের জন্য মাথায় পড়েছিল। ভ্যাগিস আমি তখন ভূগর্ভে ছিলাম, নইলে নির্ঘাত আমার মাথার মাঝখানে পড়তো।”
“ভূগর্ভে কী করছিলে?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

অপ্সরা | উপন্যাস

মানসসুন্দরী শর্মী ব্যাধিনী বেশে বনগহনে ঘোরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ অলীক পরিবেশে প্রবেশ করে কৌতূহলোদ্দীপক হয়। সূর্যাস্তের শুরুতে চাঁদের আলোয় পরিবেশ স্বপ্নীল হলে আকস্মিকভাবে বিদ্রুপাত্মক বাক্য পরিবেশে ভাসে, “ও লো শর্মী! মরি-মরি জপে লজ্জায় লাল হওয়ার জন্য জংলায় এসেছিন কেন?”
“রে কুক্কুট! নিঃসঙ্গ আসলেও তোদের একটাকে মেরেকেটে শিকে পোড়ে খাওয়ার জন্য যথেষ্ট মশলাপাতি সঙে এনেছি। মনে রাখিস! তীক্ষ্ণ তির বুকে বিঁধলে হাঁকাহাঁকির পালা পলকে সাঙ্গ হবে।” দাঁত কটমট করে বলে শর্মী তন্ময় হয়ে কান পেতে ডানে বাঁয়ে তাকায়। অপ্সরা তখন মোহনসুরে গান গেয়ে হাঁটছিল…
“হিরণবরন পাখি জিয়নে মরণে হয়েছে মোর সখি, সুখিনী হওয়ার জন্য হতে চাই সখার মুখোমুখি।”
অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে বিস্ময়াবিষ্ট কণ্ঠে শর্মী বলল, “নিগূঢ় রহস্যে রূপসী হয়েছে রহস্যময়ী আর পরিবেশ হয়েছে রহস্যময়।”
এমন সময় বাতাসে বাঘের হুংকার প্রতিধ্বনিত হলে অপ্সরা পরিবেশে অদৃশ্য হয়। শর্মী চমকে ধনুতে তির সংযোগ করে চারপাশে তাকায়। কিছু দেখতে না পেয়ে হেঁকে বলল, “টাট্টু! দৌড়ে আয়।”
ডাকের সাথে সাথে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। চিকচিকে কালো এবং তেজি আরবি-ঘোড়া সামনের ঠ্যাং তুলে হ্রেষাধ্বনি করে বশ্যত্বের প্রমাণ দিয়ে স্থির হয়ে মাথা নেড়ে কান শরীর ঝাড়ে।
“বাঘের কান্দন শোনেছিলাম।” বলে শর্মী দক্ষ আরোহীর মত লাগাম ধরে রেকাবে পা রেখে টপকি দিয়ে উঠে বসে সামনে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে কান পাতে। কিছু শুনতে না পেয়ে ধনুতে তির সংযোগ করে গায়ের জোরে টানিয়ে ছেড়ে লাগাম ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, “টাট্টু! দৌড়া।”
হ্রেষাধ্বনি করে ঘোড়া মহাবেগে দৌড়ে। দু পা দিয়ে আঘাত করে বার বার ঘোড়াকে উসকানি দেয়, “টাট্টু! আরো রোষে।”
তির গাছে বিঁধলে লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামিয়ে ঝম্পে নেমে ঘোড়ার চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে শর্মী বলল, “ভুসি তুষ খেয়ে তুই খোদার খাশি হয়েছিস! রোষ-জোশের লেশ তোর মাঝে নেই। নিস্তেজ কোথাকার!”
হ্রেষাধ্বনি করে ঘোড়া মাথা নাড়ে। অনতিদূরে শ্বেতকায় বাঘ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গোঙাতে দেখে কোষ থেকে ভোজালি বার করে চারপাশে তাকিয়ে কিছু দেখতে না পেয়ে কান পাতে। বাঘ গর্জিয়ে গোঙালে কিছু লোক আছাড়ি পিছাড়ি খেয়ে দৌড়ে পালায়।
“কাঙালের দল! ধরতে পারলে তোদেরকে আমি আচ্ছা করে ঠ্যাঙাব মনে রাখিস!” রাগান্বিতকণ্ঠে বলে শর্মী ভোজালি কোষে রেখে ঘোড়ার লাগাম ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে বলল, “আপোশে পোষ মানলে আশেপাশে থাকতে পারবে নইলে আজীবন আপসোস করবে। টাট্টু! আগ বাড়, বাগুরা ভেঙে বাঘকে মুক্ত করতে হবে। মুক্ত হয়ে অকৃতজ্ঞের মত আক্রমণ করলে কী করব?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

মানসী | উপন্যাস

আকাশ ঝামরিয়ে পরিবেশ মেঘাচ্ছন্ন হলেও বনবাদাড়ে বসন্তোৎসব। লীলাচঞ্চলে পুষ্পসুবাস। পরিযায়ী পাখিরা তামাবিলে নেমে জলকেলি করছিল। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে তুহিন গুনগুন করে চারপাশে তাকাচ্ছিল। আশেপাশে লোকজন নেই। চোখ বুজে গানে টান দেবে এমন সময় মেঘডম্বর ফেটে তামাবিলে বাজ পড়ে ছ্যাঁৎ করে উঠলে পাখিরা উড়াউড়ি করে। তুহিন বুকে থু থু দিয়ে মাথা তুলে সামনের বাসার দিকে তাকায়। সালোয়ার কামিজ পরিহিত যুবতী তড়বড় করে গাড়ি থেকে নেমে ভোঁ দৌড়ে বাসায় প্রবেশ করার সাথে সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি অঝােরধারে ঝরে, যেন একবারের বর্ষণে বান ডাকবে। ঠাঠার ডরে দাঁত কটকট করে তুহিন দৌড় দিতে চেয়ে সামনের বাসার ছাদের দিকে তাকিয়ে নিম্নকন্ঠে বললো, “বৃষ্টিবিলাসিনী নিশ্চয় অলোকসুন্দরী?”
যুবতী তখন ছাদে উঠে দু হাত মেলে মনোল্লাসে বৃষ্টিস্নান করছিল। বৃষ্টিসজল উজ্জ্বলাকে দেখে কাব্যরসিকের মতো ভাববোলাকণ্ঠে কবিতাবৃত্তি করে…

“বৃষ্টিতে ভিজে জেল্লাময়ী পরিপার্শ্বে কামানল জ্বালিয়েছে। বৃষ্টিভেজা বিতনুকে দেখে মিনমিনে মন চনচনে হতে চাইছে। হে বৃষ্টিবিলাসিনী! তোমাকে বাহুতে পাওয়ার জন্য আমি অপেক্ষমাণ। বরণ করলে অবিস্মরণীয় হবে বর্ষণমুখর বাদলসন্ধ্যা।”

তার মনের কথা মানসীর কানে না পৌঁছে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে অস্পষ্ট হয়। আনন্দোদ্ভাসিত বৃষ্টিবিলাসিনীর প্রাণবন্ত চাঞ্চল্যে তুহিন জীবনীশক্তির সন্ধান পেয়ে আনন্দবিহ্বল হয়ে অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। অবিরলপাতে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করলে বৃষ্টি এবং বৃষ্টিবিলাসিনীকে ধন্যবাদ বলে সে দ্রুত নেমে গোসলখানায় প্রবেশ করে এবং মাথা ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে নিম্নকন্ঠে বললো, “আটানব্বই টাকায় আটান্নটা ঘোঁটনকাঠি কিনেছিলাম, আটাত্তরটা বরাদ্দ করলে আঠাকাঠিতে ঠাঠা পড়েছিল। এখন ঠাঠা গরম চায় চুমুক দিতে হবে নইলে সারারাত দাঁত কটকট করবে।”

এমন সময় বার কয়েক বিজলি চমকালে আনন্দোচ্ছল যুবতী সন্ত্রস্তা হয়। তুহিন শুকনো কাপড় পরে আস্তেধীরে হেঁটে জানালার পাশে যায় এবং দু হাতে কপাট খুলে চৌকাঠে ঠেক দিয়ে সামনের বাসার দিকে তাকায়। বৃষ্টিবিলাসিনী তখনও বৃষ্টিস্নান করছিল। তুহিন মৃদু হেসে শিউরে হাতে হাত মলে দু হাতে মুখ ঢেকে হাঁচি দিয়ে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে আরো কয়েকটা হাঁচি দিয়ে ডান হাতে নাক ঘষে এবং আরো হাঁচি আসতে চাইলে কাঁধ ঝুলিয়ে হতাশকণ্ঠে বললো, “এ কী সর্বনাশ করেছি?”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

সত্য প্রেম | উপন্যাস

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, রমণে রমণীয় হয় রমণী এবং রত্নশিল্পীর কলাকৌশলে নীল পাথর হয় নীলকান্তমণি। কিংবদন্তি হলেও রত্নবনিকরা বিশ্বাস করে এবং বাতাসে কানাঘুষো, নীলগিরির গুপ্ত গুহায় সংগুপ্ত নবরত্ন আছে। তা শুনে কেউ আষাঢ়ে গল্প আর কেউ বলে কোটারি যেমন কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে পারে তদ্রুপ নীলগিরিতেও রত্নের খনি থাকতে পারে, এর মানে সত্যাসত্য জানার জন্য সন্ধানী হলে প্রকৃত তথ্য এবং রত্নের সন্ধান মিলবে। যেমন, অনুধ্যানে আত্মান্বেষীরা আত্মদর্শন করে এবং পরমসত্যান্বেষণে সত্যান্বেষীরা চিন্ময় হয়। তত্ত্বানুসন্ধানে সমাজতাত্ত্বিক না হতে পারলেও মনস্তাত্ত্বিক অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক হওয়া যায় এবং আপখোরাকির জন্য স্বার্থান্বেষীরা তক্কেতক্কে ঘোরায়। এমন এক অন্বেষক জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানের অলোক-সুন্দরী উপস্থাপিকার কণ্ঠহারের মধ্যমণি দেখে নবরত্নের অন্বেষক হয়। তার নাম আনীল। বই অভিধান ঘেঁটে নবরত্নের নাম জানলেও নিশ্চিত হতে পারেনি, নীলাচলের নীলগিরি না ওড়িশার নীলগিরিতে তা লুক্কায়িত। গূঢ়তত্ত্ব জানার জন্য উপস্থাপিকার সাথে তথ্য লেনদেন করতে যেয়ে আপাতদৃষ্টে ভালোবাসার সূত্রপাত হয়। তথ্য চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, স্থিরচিত্তে সিদ্ধান্ত করে অভিযাত্রী বেশে বেরিয়ে দেশের নিগূঢ়তম প্রদেশে প্রবেশ করে ব্যস্ততার মিছিলে মিশে অদৃশ্য হলে তার অপেক্ষায় উপস্থাপিকা অপেক্ষিত হয়। বিশ বাইশ বছর পর ভরদুপুরে নীলা নামক যুবতীর মুখোমুখি হলে উদ্ভট কাণ্ড ঘটে। ভয়বিস্ময়ে ভিরমি খেয়ে নীলা এলিয়ে পড়লে আনীল চোখ বুজে অগ্নিমন্ত্র জপে বাতাসে হাত বোলায়। তার হাতের ছায়া মুখের উপর পড়লে চোখ মেলে তার মাথার উপর সূর্যকে দেখে নীলা চিৎকার করে। লোকজন জড়ো হলে নিলীয়মান আনীলের কণ্ঠ নীলার কানে প্রতিধ্বনিত হয়, “নভোনীল শাড়ি পরে নীলা হয়েছ তুমি নীলিমা হতে পারনি। আনীলে নীল মিলে নীলিমা হলেও নীলাঞ্জনাকে নীলা ডাকা যায় না। অলোক-সুন্দরীর নয়ন নীল হলে ওকে নীলনয়না না ডেকে নীলা ডাকা মানানসই।”

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

time to respect nature

climate_change

It is time to respect nature or we will be doomed. All other creatures ensure the safety of their offspring, only we are putting our offspring in danger.

প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করার সময় হয়েছে নইলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। অন্যসব জীব তাদের সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, শুধু আমরা আমাদের সন্তানদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র