শান্তিরক্ষক

শান্তিরক্ষকার_গল্প

রাক্ষস খোক্কসরা দেবশত্রু। নিজেকে অবিনশ্বর ভাবলেও ওরা মানুষের মত নশ্বর। রাক্ষসরা ক্রব্যাদ এবং তাদের দেশের নাম ক্রব্য। রাক্ষসরাও রাজা মানে। হিংস্রশ্রেষ্ট রাক্ষস তাদের রাজা। সেই রাক্ষুসে রাজার রাক্ষসপুরীতে রাক্ষসীর গর্ভে নরাশ এবং অনুশর জন্মে রাক্ষসবংশের যক্ষরক্ষ হয়। তাদের শিরায় রক্তবীজ। রাক্ষুসে রাজার আদেশে ওরা রাক্ষসকুলরক্ষণের ব্রত করে। হঠাৎ বিভ্রাটে পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে অনুশর মনুষ্যরাজ্যে প্রবেশ করে এক মনুষীর প্রেমে পড়ে ক্রমাগত প্রথার ক্রমভঙ্গ করে। অনন্যসাধারণ মনুষী রূপেগুণে মনোমোহিনী এবং দুর্গতিনাশিনী। ওর হাসির শব্দে শোক সন্তাপের সর্বনাশ হয়। কুমারী রাক্ষসী নরাশকে ভালোবাসে। নরাশ ওকে সহ্য করতে পারত না। ওদের রেষারেষি এবং বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিদ্বন্দিতায় রাক্ষসপুরে সুখ শান্তি নষ্ট হয়। রাক্ষুসি ছিল অত্যন্ত কুৎসিত আর মনুষী ছিল পরমা সুন্দরী।
মনুষীর খবর পেয়ে রাক্ষুসি এবং নরাশ মনুষ্যরাজ্যে অনুপ্রবেশ করে। নরাশের একমাত্র কাজ ছিল হানাহানি আর জুজুবুড়ি সেজে রাক্ষুসি মানুষকে কুমন্ত্রনা দিতো। মনুষ্যরাজ্যে এক কুটুনিবুড়ী ছিল। ওর নাতি মনুষীকে ভালোবাসতো। মনুষী ভালোবাসতো অন্য মনুষ্যকে। সেই মনুষ্য ছিল মনুষ্যরাজ্যের শান্তিরক্ষক। রাক্ষস আর রাক্ষুসির আগমনে মনুষ্যরাজ্যের শান্তি নষ্ট হয়। নরাশ মনুষীকে খুঁজে পায় না। কুটনিবুড়ী তাকে ঠিকানা বাতলে দিলে মনুষীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাতে মনুষ্যরা অসুখি হয়। সুখ এবং শান্তি রক্ষার জন্য মনুষ্য অসি হাতে নিলে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। মানুষ মরে রাজ্য খালি হতে শুরু করে কিন্তু নরাশকে নাশ করা যায় না। তার গায়ে অসির ছেদ পড়লে রক্তবীজ থেকে শাতধিক রাক্ষস জন্মে।
মনুষ্যের বীরত্ব দেখে রাক্ষুসি তার প্রেমে পড়ে। মনুষীকে উদ্ধার করার মানসে মনুষ্য রাক্ষুসির সাথে চুক্তি করে। নরাশকে নাশ করার উপায় বাতলে দিলে নরাশকে ওর গোলাম বানিয়ে দেবে। রাক্ষুসি রাজি হয়ে উপায় বাতলে দেয়। মনুষীর তালপুকুরের ঠিক মাঝখানে এক কুঠুরি। সেই কুঠুরির মাঝখানে এক কোঠা আছে এবং সেই কোঠার ঠিক মাঝখানে সোনার পালঙ্কে মনুষীকে সংবেশ করে রেখেছে। শিথানে মরণকাঠি এবং পৈঠ্যনে জিয়নকাঠি। কাঠি দুটা উলট পালট করতে হবে। নরাশের প্রাণপাখি মনুষীকে সতর্ক পাহারা দেয়। সেই পাখিকে মারতে পারলে নরাশের সর্বনাশ হবে। পাখির রক্ত মাটিতে পড়লে অথবা পাখি মুক্ত হলে মনুষ্যরাজ্যে কল্পান্ত শুরু হবে। নরাশের প্রাণপাখি তো আর মামুলি নয় যে ঢিলে কুপোকাত হবে।
মনুষ্যরাজ্যের শান্তি রক্ষার একমাত্র পথ মনুষ্য অবলম্বন করে। অসি হাতে পুকুরে ঝম্পে ডুবে কুঠুরিতে ঢুকে সে হতবাক হয়। দেখতে হীরামনপাখির মত কিন্তু তার পাখনায় অসুরের শক্তি। উড়াল পাখির গায়ে ছেদ মারলে মাটিতে রক্ত পড়বে। দরজা ভেঙে বেরোলে কল্পান্ত শুরু হবে।
পাখি ছটপট শুরু করলে নরাশ টের পেয়ে দৌড়াতে শুরু করে এবং পুকুর পারে পৌঁছলে রাক্ষুসি তাকে কাবু করে। তখন পাখিকে ঝাপটে ধরে মনুষ্য কাঠি রদবদল করলে মনুষীর উজ্জীবীত হয়ে ওঠে বসে। মনুষ্য ওর হাতে অসি দিয়ে বলল, ‘ওগো বরণীয়া, সর্তকতার সাথে এই পাখির ধড় আলাদা করতে হবে, রক্ত মাটিতে পড়লে কল্পান্ত শুরু হবে।’
মনুষী কখনো ডাল থেকে ফুল ছিঁড়েনি, অসির ছেদে পাখির ধড় আলাদা করা ওরা জন্য আপাত-অসম্ভব। মনুষ্য ওকে সবিনয়ে বলল, ‘ওগো মনমোহিনী, মনুষ্যরাজ্যে এখন আর সুখশান্তি নেই। ভামিনী বেশে এই পাখির গর্দান নিলে তোমার রাজ্যে সুখ ফিরবে।’
মনুষী বিচলিত হয়ে বলল, ‘তুমি আমার সুখ হরণ করেছ।’
মনুষ্য সানন্দে হেসে বলল, ‘বরনারী তুমি পাখির গর্দান নিলে আমি তোমাকে বরণ করব।’
‘আমি প্রজায়িনী হতে চাই।’ বলে মনুষী হাঁটু গেড়ে বসে। দাঁত কটমট করে মনুষ্য পাখির ঠ্যাং এবং গর্দনা টেনে ধরে। মনুষী বাম হাতের আঁজলা পাখির গলার নিচে রেখে এক ছেদে ধড় আলাদা করলে নরাশ লুটিয়ে পড়ে হাত-পা ছুড়ে যমপুরে চলে গেলে মনুষ্যরাজ্যে আবার শান্তি-স্বস্তি প্রতিষ্টিত হয়।

বইর নাম — আঠারোটা অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

বিয়ে পাগলা

বিয়ে_পাগলার-গল্প

বিয়েপাগলার বয়স বারো হতেই সে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়েছিল। অন্যরা না বুঝলেও যে বুড়ি বুঝছিল, সেই বুড়ি কুড়িতে নাবুড়ি হয়েছিল। বুড়োরা ওর সাথে দূরত্ব বজায় রাখে। বুড়ি ভূঁ বললে বুড়োরা উড়ে দূরে পড়ে পড়ি কি মরি করে দৌড়ে। তো কী হয়েছিল, বিয়েপাগলা বাল্যকাল পাড়ি দিয়ে জোয়ান হয়ে লাঠিতে পুটলা বেঁধে হাঁটতে শুরু করে। কাজ করে না, জেবে টাকা নেই। টোনার মত দিনমান টুনি খোঁজে। লেবু গাছ বলো আর তাল গাছ সব গাছের তলে একবার সে বসেছে কিন্তু সুন্দরী টুনির দেখা পায়নি। তাকে দেখলে টুনিরা কাঁটাবনে লোকায়। বাতাসে কানাঘোষা, বিয়েপাগলা নাকি টুনি ভোনে খায়। একদিন ভাগ্যচক্রে ঘুরপাক খেয়ে নাবুড়ির সাথে তার দেখা। প্রথম দেখায় প্রেমে মজে গাঁটছড়া বেঁধে শণ বাঁশ দিয়ে ঘর বানিয়ে সংসারী হওয়ার সাথে সাথে সমস্যার সূচনা হয়। বিয়েপাগলার কয়েকটা হাতি ছিল, যেমন করে হোক ভরণপোষণ করলেও বউর বেলায় সম্যসা হয়। কাজ নাই, জেবে টাকা নাই। প্রতিদিন বিদেশী খাবার খাওয়াতো আর মুখের কথা নয়। সাথে দেশিখাবার তো আছেই। এক রাতে বিরক্তোক্তি করে পাগলা বলল, এক বউ এক শো হাতির সমান। এক শো হাতির বোঝ এক গাধা বইতে পারে।

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

উপন্যাস সমগ্র

অবলীলা ]-[ মানসী ][ গুণমণি ]-[ পূর্বরাগ ]-[ স্বয়ম্বরা ]-[ সত্য প্রেম ]-[ হাজিবাবা ]-[ অমানিশাত ]-[ নীলকমল ]-[ অপ্সরা ]-[ অন্যাকর্ষণ ]-[ কাব্যরসিকা ]-[ আত্মাভিমানী ]-[ ধাধসপুরে বারবেলা ]-[ জাতে বাংলাদেশি ]-[ বৃত্তে বৃত্তান্ত কবিতার বই ]-[ অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস ]-[ পরমাত্মীয় (মহোপন্যাস) ]-[ Love tune

মোহাম্মাদ আব্দুলহাক

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র

Published books
Published books

জহ্নু | ছোট গল্প

অলোকসুন্দরী জহ্নু মা বাবার সাথে পার্বত্য অঞ্চলে থাকে। তাদের বাড়ি পহাড়ের উপর। বনচারীরর মত দিনমান বনবন ঘোরে। পিঠে তির ধনু। কোমরে ভোজালি এবং শঙ্খ বাঁধা। ডরে ভয়ে বদরা ওর সাথে বদমাশি করে না। জহ্নুকে দেখলে তাদের স্নায়ুবিকার হয়। জহ্নু শখ করে বনমোরগ এবং তিতর পোষে। শালিকের সাথে মারামারি করে ডাগরডোগর মোরগা মরার পর থেকে বেড়াজালে ঘের-বেড় দিয়েছে। মা বাবা বেরিয়ে গেলে পাখিকে আধার-পানি দিয়ে শবরী বেশে বেরোয়। দলছুট ধনেশ পাখি দেখে ধুনতে তির জোড়ে তাক করলে শালিক আক্রমণ করে। ধনু নামিয়ে ডান হাতে ভোজালি বার করে জহ্নু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়। চোখের সামনে ওর স্বপ্নের সুপুরুষ।
‘সহিষ্ণু, উড়ে আয়।’ পুরুষ হেঁকে বললে শালিক উড়ে যেয়ে তার কাঁধে বসে।
‘এই বদমাশ আমার মোরগা খুন করেছে। একে আমি শিকে পোড়ে খাব।’ বলে জহ্নু তির ধনু তাক করলে পুরুষ হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার মোরগার গলায় আমি দা লাগিয়েছিলাম। তির মারতে চাইলে আমার বুকে মারো।’
‘তোমার বুকে তির মারব কেন? এই খুনিকে আমি এখুনি খুন করব।’ বলে জহ্নু দাঁত কটমট করে ধনু টানলে বুক পেতে পুরুষ বলল, ‘প্রেমে পড়লে মন পোড়ে। বিরহানলে পুড়ে মরতে চাই না।’
মাথা কাত করে অপলকদৃষ্টে তাকিয়ে জহ্নু বলল, ‘দেখো কেমন ইতরের মতো তাকিয়ে আছে। দাঁড়া, আজ তোর ইতরামি বার করব।’
‘এবারের মত প্রাণভিক্ষা দিলে পরের বার তিতর খুন করবে।’ বলে পুরুষ শরীর কাঁপিয়ে হাসলে কপাল কুঁচকে জহ্নু বলল, ‘এই পাহাড়ের ধারেপাশে চোরচোট্টা আসে না। কেন এসেছ?’
‘খালি মারামারি। আধমরা হয়ে জংলায় এসেছি। আমার বিশ্বাস, বাঘরা আমার সাথে খাবার ভাগাভাগি করবে।’ বলে পুরুষ ডান হাত কাঁধের কাছে নেয়, ঝম্পে শালিক হাতে গেলে উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘তাকে খুঁজে বার কর যে আমার মন চুরি করেছে।’
শালিক উড়ে যেয়ে জহ্নুর কাঁধে বসলে পুরুষ হাঁটতে শুরু করে বলল, ‘তোমার নামে মামলা করার জন্য আমি এখন থানায় যাব।’
‘শালিক নিয়ে যাও।’
পুরুষ কিছু না বলে হাঁটতে থাকলে জহ্নু হেঁকে বলল, ‘বিদেশি, নাম বলে যাও।’
‘এখন থেকে আমার নাম বিদেশি।’
‘কেন এসেছিলে?’
‘ওরা বলেছিল জহ্নুপুরে প্রবেশ করলে কেউ জীবিত ফিরে যায় না।’
‘আমি জানতে চেয়েছিলাম তুমি কেন এসেছিলে?’
‘জহ্নুকে দেখার জন্য।’
‘দেখেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার শালিক নিয়ে যাও।’
‘সহিষ্ণু, জহ্নুকে দেখে রাখিস।’ বলে পুরুষ ডান হাত উঠিয়ে নাড়লে জহ্নু রেগে দাঁত কটমট করে ধুন টেনে তির ছেড়ে বলল, ‘আমার আনন্দ ফিরিয়ে দাও।’
পায়ের পাশে তির গাঁথলে পিছন ফিরে বিদেশি বলল, ‘তুমি আমার আনন্দ। আমার সুখস্বপ্নের নাম জহ্নু।’
‘বিদেশি, বেশি বাড়াবাড়ি করলে কলিজা বার করব।’
‘বুকে তির মারার জন্য মিনতি করেছিলাম।’
‘বিদেশি!’
‘জহ্নুপুরে আমি আর আসব না। খুঁজে বার করতে পারলে আমি তোমাকে বিয়ে করব। সহিষ্ণু! জহ্নুর কিছু হলে আমি তোকে শিকে পুড়ে খাব।’
শালিক ওড়াওড়ি করলে জহ্নু মাথা উঠিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দৌড়াতে শুরু করে বলল, ‘বিদেশি! টুকি দিয়ে দৌড়ে লুকাও, আমি তোমাকে খুঁজে বার করব।’
‘জহ্নু, তোমাকে ভালোবেসে আমি অনামিক হয়েছি।’ পুরুষ হেঁকে বললে জহ্নু দাঁড়িয়ে বলল, ‘বিদেশি, তোমাকে বিয়ে করার জন্য আমিও মরণপণ করেছি।’
‘জহ্নু, বাজুতে জোর থাকলে তির মারো।’
‘দূর হ বল্লা কোথাকার।’
‘কী হলো?’ বলে বিদেশি পিছু হাঁটে। কোমর থেকে শঙ্খ খুলে ছোড়ে মেরে জহ্নু বলল, ‘বনে চোরাশিকারি আছে। বিপাকে পড়লে শঙ্খ বাজাবে। তুমি বেঘোরে মরলে আমি অশরীরিণী হব।’
শঙ্খ লোফে বিদেশি বলল, ‘তোমার শক্তিমত্তা দেখার জন্য এসেছিলাম।’
‘আসো, এখুনি একহাত হবে।’
‘আজ না আরেকদিন।’ বলে বিদেশি হাত নেড়ে দৌড় দেয়। জহ্নু রেগে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বৃহদাকার বাজপাখি জালে আটকে বেড় প্যাঁচ খেয়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়। শালিক ক্যাঁচর ম্যাচর শুরু করলে দৌড়ে যেয়ে মোরগ এবং তিতর বার করে ভোজালি হাতে নিয়ে মাথা কাত করে বাজপাখির দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘ইস, বিদেশির মতো তুইও ক্লীব হয়েছিস। তোদের ক্লেশে ক্লিশ্যমান হয়ে আমি ক্ল্যাসিকাল কষ্টে ক্লিষ্ট হয়েছি।’
শালিক উড়ে যেয়ে মোরগার সাথে মারামারি শুরু করলে জহ্নু চিৎকার করে বলল, ‘রে শালিকের বাচ্ছা, আজ তোকে জানে মেরে ফেলব।’
শালিক উড়ে গাছের ডালে বসে এবং বাজপাখি কাতরাতে শুরু করলে কপালে আঘাত করে জহ্নু বলল, ‘নাজানি কোন অনামুখোর মুখ দেখে আজ সূর্য ওঠেছিল? দুনিয়ার সকল আপদ বিপদ এককাট্টা করে আমার মাথার উপর খাড়া হয়েছে। এই বাজের বাচ্ছাকে মুক্ত করব কেমনে? ওরে আলাইর পাল, হাত জোড়ে সবিনয়ে মিনতি করছি দয়া করে আমাকে নিস্তার দাও।’
মোরগা এবং শালিক আবার মারামারি শুরু করলে জহ্নু কাঁধ ঝুলিয়ে বেসে শালিক এবং মোরগার মারামারি দেখে তাজ্জব হয়। মোরগারা আনতাবড়ি দৌড়ালে কপালে আঘাত করে জহ্নু বলল, ‘ভুসি খাইয়ে ভুষ্টিনাশ করেছি। একটা শাকিল দশটা মোরগাকে মেরে আধমরা করেছে। আজ থেকে আর শিকারে যাব না। রোজ একটা মোরগা শিকে পুড়ে খাব। দুর্বলের দল, আমার সম্মুখ থেকে দূর হও।’
বাজপাখি কাতরালে চোখ পাকিয়ে দাঁত কটমট করে জহ্নু বলল, ‘বাজের বাচ্ছা তুই চোপ কর। আমার এতদিনের কষ্ট এক ঠুকরে নষ্ট করেছে। বেশি কোঁতালে গলায় ভোজালি লাগাব। হায় হায়, এণ্ডাবাচ্ছা শালিকের সাথে আড়াই গণ্ডা মোরগায় পারেনি। এই খবর যে শুনবে সে হাসবে।’
বাজপাখি নড়াচড়া করলে বিরক্তোক্তি করে ভোজালি দিয়ে জাল কেটে জহ্নু দৌড়ে দূরে যায়। বাজপাখি মাতালের মত হেঁটে ডানে বাঁয়ে তাকায়। শালিক উড়ে জহ্নুর কাঁধে বসে। জহ্নু চিন্তিত হয়ে বাজপাখির দিকে তাকিয়ে দৌড়ে ঘরের ভিতর যেয়ে তাগারি হাতে বেরিয়ে উঠানে রেখে দৌড়ে সরে। বাজপাখি পানি পান করে ডানা ঝাপটালে জহ্ন চোখ বুজে শিউরে ওঠে। শালিক ক্যাঁচর ম্যাচর শুরু করলে চিন্তিতকণ্ঠে জহ্নু বলল, ‘এত বড় বাজ বাপের জন্মে দেখিনি। ভালো করে তাকিয়ে দেখ, চালিশার দোষ দূর হবে। তোর মতো হাজার শালিকে তার এক গ্রাস হবে না। ক্যাঁচর ম্যাচর বন্ধ কর নইলে আমাকে সুদ্ধ খেয়ে ফেলবে।’
বাজ এগুলে কপালে আঘত করে জহ্নু বলল, ‘ইতর তিতর সবগুলোকে আজ খেয়ে ফেলবে। হয়া রে হায়, কেন যে এত কষ্ট করেছিলাম।’
বাজপাখি বার বার ডানা ঝাপটে কিন্তু উড়াল না দিলে জহ্নু চিন্তিত হয়ে আস্তেধীরে অগ্রসর হয়। বাজপাখি নম্রকণ্ঠে ডাকলে জহ্নু চোখ বুজে শিউরে ওঠে। বাজপাখি মাথা ঘুরিয়ে নম্রকণ্ঠে ডাকতে থাকলে জহ্নু বুক ভরে শ্বাস টেনে আবার অগ্রসর হয়। শালিক উড়ে যেয়ে ওর কাঁধে বসে। বাজপাখি মাথা নত করে ডানা মেলে। জহ্নু কপাল কুঁচকে পাশে গেলে বাজপাখি ডানা ঝাপটায়। জহ্নু হাত বাড়িয়ে সানন্দে বলল, ‘তুই সত্যি কৃতজ্ঞ। তোর হাবভাবে আমি অবাক হয়েছি। এখন চাইলে উড়ে যেতে পারবে অথবা বিশ্রাম করতে পারবে। এই খুনির নখ থেকে ওদেরেকে বাঁচাবার জন্য জাল দিয়ে বেড়া দিয়েছিলাম।’
বাজপাখি ডানা মেলে ঝাপটে ডাকাডাকি করলে জহ্নু চিন্তিত হয়। শালিক ক্যাঁচর ম্যাচর শুরু করলে দৌড়ে যেয়ে ধনুতে তির জোড়ে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে কিছু না দেখে উঠানের সীমান্তে যেয়ে ধনু টানিয়ে তির ছাড়ে। পুরুষ চিৎকার করে ল্যাংড়িয়ে দৌড়ে পালায়। অপলকদৃষ্টে বাজপাখির দিকে তাকিয়ে জহ্নু বলল, ‘আমি তোকে বহরি ডাকব। শোন, চাইলে সেগুনগাছে বাসা বানাত পারবে। মাই বাপু কিচ্ছু বলবে না। তুই আশে পাশে থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব। চারপাশে তাকিয়ে দেখ, স্বয়ম্ভর হও‍য়ার জন্য এই বনে যথেষ্ট সম্পদ আছে। বাপ দাদার সম্পদ একলা সামলাতে পারব না। কাপুরুষরা চারপাশ থেকে আক্রমণ করে।’
ডানা ঝাপটে ডাকাডাকি করে বাজপাখি উড়াল দেয়।
‘প্রয়োজন হলে তোকে ডাকব।’ বলে জহ্ন ব্যস্ত হয়। বিদেশি তখন বনে ঘোরাফেরা করছিল, হঠাৎ চোরাশিকারিরা আক্রমণ করলে সে শঙ্খ বাজায়। শালিক ক্যাঁচর ম্যাচর শুরু করলে, জহ্নু চোখ বুজে দুহাত উঠিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলল, ‘বহরি! ফিরে আয়।’
পলকে বাজপাখি ফিরে জহ্নুর দুহাত ধরে উড়াল দেয়। শালিক তাদেরকে অনুসরণ করে। দুহাতে বাজের ঠ্যাং ধরে জহ্নু চোখ বুজে মনশ্চক্ষে বিদেশিকে দেখে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে বলল, ‘বহরি, সামনে আমার বর। তাকে সাহায্য করতে হবে।’
বাজপাখির ডাক শুনে বিদ্রুপহেসে চোরাশিকারিদের দিকে তাকিয়ে বিদেশি বলল, ‘দৌড়ে পালাও নইলে তোদেরকে আজ বাজের ভোজন বানাবে।’
চোরাশিকারিরা দৌড়াতে শুরু করলে শালিক তাদেরকে তাড়া করে। জহ্নুকে নামিয়ে বাজপাখি ডালে বসে ডাকাডাকি করে। শালিক উড়ে যেয়ে বিদেশির কাঁধে বসে। জহ্নু দৌড়ে যেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘মারধর করেনি তো?’
‘ওরা বলেছিল এই বনে দানবী আছে। ওরা বলেছিল বাগে পেলে কলিজা বার করে খাবে। ওরা বলেছিল জহ্নুপুরের আরেকনাম যমপুর।’
‘তুমি তাদেরকে কী বলেছিলে?’
‘বলেছিলাম দানবীকে আমি দেখতে চাই।’
‘দেখেছ?’
‘তন্নতন্ন করে খুঁজেও হদিশ পাইনি।’
‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। না বললে বাজের ভোজন বানাব।’ বলে জহ্নু দাঁত কটমট করে। শঙ্খ এগিয়ে দিয়ে শরীর কাঁপিয়ে হেসে বিদেশি বলল, ‘চাইলেও তুমি দানবী হতে পারবে না। সহিষ্ণু, চল ফিরে যাই।’
জহ্নু চোখ বুজে শঙ্খ বাজালে যুবক যুবতীরা রুখে দাঁড়ায়। তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বিদেশি বলল, ‘ওরা তাইলে সত্য বলেছিল?’
‘আমরা স্বয়ম্ভর। এই বন আমাদের রাজ্য। আমাদের রাজ্যে অন্যায় অত্যাচার হয় না। আমাদের রাজ্যে যা আছে তা ব্যাবহার করে আমরা জীবনযাপন করি। চোরাশিকারিরা এসে আমাদেরেক মারধর করে।’ বলে জহ্নু হাসার চেষ্টা করলে বিদেশি বলল, ‘বনাঞ্চল সংরক্ষণের জন্য আমি এসেছিলাম। তোমাদের আচার-আচরণ এবং জীবনযাপনে আমি আকৃষ্ট হয়েছি।’
বিদেশিকে থামিয়ে জহ্নু বলল, ‘আমরা মারামারি করি না। বনে আগর চন্দন আছে। আছে পশুপাখি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে সকলের মঙ্গল হবে।’
‘চোরাশিকারিরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তুমি না আসলে আমাকেও পুঁতে রাখতো এবং পুলিসরা আমার লাশ খুঁজে পেত না। ধন্যবাদ। আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’ বলে বিদেশি হাসার চেষ্টা করলে হাবভাব বদলিয়ে গম্ভীরকণ্ঠে জহ্নু বলল, ‘তুমি চলে যাবে নাকি?’
‘হ্যাঁ, আমার দায়িত্ব কর্তব্য শেষ হয়েছে।’
‘কর্তব্য-অকর্তব্যের বিচার আমরা করি না। বাছ-বিচার করে আমরা চলি না। ছোঁয়াছুঁয়ি এবং এঁটোকাঁটার অর্থ আমরা বুঝি না। তুমি চলে যেতে চাইলে চলে যেতে পারবে, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।’ বলে জহ্নু একপাশে সরে দাঁড়ালে চারপাশে তাকিয়ে বিদেশি বলল, ‘আমিও বাছাবাছি করি না। তোমার মা বাবার সাথে দেখা করার জন্য আমার মা বাবা আসবেন। তুমি হয়তো খেয়াল করনি, আমাদের মত সহিষ্ণুরও বিয়ের বয়স হয়েছে।’
‘সাফসাফ করে বলো।’
‘তুমি চাইলে আমাকে বিয়ে করতে পারবে।’ বলে বিদেশি কপট হাসলে মাথা নেড়ে পিছু হেঁটে দৌড়াতে শুরু করে জহ্নু বলল, ‘নিষ্ঠুরের মত তুমি আমার মনকে কাঁদিয়েছ।’
বিদেশি দৌড়ে যেয়ে জহ্নুর হাত ধরে থামিয়ে হাত জোড়ে বলল, ‘মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছিলাম। সত্যাসত্য জানা সত্ত্বেও বাস্তবতা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’
পলকে তাকে কাবু করে গলায় ভোজালি লাগিয়ে দাঁত কটমট করে জহ্নু বলল, ‘বেশি ভাঁড়ামি করলে ভেড়ার মত গলার রগ কেটে ফেলব।’
‘আমার গলার রগ কেটে কাঁচা রাঁড়ি হতে চাইলে আমি তোমাকে বাধা দেব না।’
‘পথ পালটে উলটা পথে দৌড়াও নইলে কিলিয়ে কাহিল করব, বদ কোথাকার।’ বলে জহ্নু মুখ বিকৃত করলে দু হাত মেলে বিদেশি বলল, ‘পিঁজরা ভেঙে স্বাধীন করে দিলাম। যত দূর যেতে চাও যাও উড়ে যাও। পায়ে শিকল বাঁধা, আমি আর বাধা দবে না, পারলে তুমি উড়াল দাও।’
‘অনিমিখে আমার চোখের দিকে তাকিয় না, ভয় পাবে।’ বলে জহ্নু অপলকদৃষ্টে তাকায়। বিদ্রুপ হেসে বিদেশি তাকিয়ে থাকলে জহ্নু ভূঃ বলে কোঁদা দিলে বিদেশি চমকে ওঠে। জহ্নু দৌড়াত শুরু করে হেঁকে বলল, ‘তোমার মতো ভিতুকে আমি আর বিয়ে করব না।’
বিদেশি হাসতে হাসতে জহ্নুকে অনুসরণ করে।

-সমাপ্ত –

© Mohammed Abdulhaque

অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস

উপন্যাস সমগ্র