নীলকমল

দুঃসাহসিক ভালোবাসার গল্প

আগামী মাসে দ্বাদশশ্রেণীর পরীক্ষা শুরু হবে। ছাত্র ছাত্রীদের শঙ্কিল মনে বেজায় আতঙ্ক। অনাবশ্যক এবং অত্যাবশ্যক শব্দের অর্থ জেনে ওরা প্রয়োজনে কথা বলে অপ্রয়োজনে একে অন্যকে এড়িয়ে চলে। পাঠানু-রাগী ছাত্র ছাত্রীরা পাঠাগারে বসে পাঠ্যক্রমানুযায়ী পঠন-পাঠনে ব্যস্ত। কলেজাঙ্গনে তাদের দেখা না পেয়ে আস্তেব্যস্তে অন্যরা যেয়ে এককাট্টা হয়। কারো হাতে মিঠা শরবত, কারো হাতে ঠাণ্ডামিঠাই। ইদানীং গায়ে পড়ে তাদের সাথে ভাব জমাতে সবাই মহাব্যস্ত। তা শুধু পরীক্ষা নাম্নী বিপদসংকেত বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলে হয় এবং বরাবরই পরীক্ষাপত্রে শেষ অক্ষর লিখে, কলমের ভাবী কলমিলতা, পুঁথিশালার দুলাভাই চশমাআলা, এসব বলে কটূক্তি করে বিধায় বইপোকারা এবার লাই দিচ্ছে না। কলেজ কামাই করে যারা শিকে পোড়ে ঘুঘু খেয়ে গায়ে মাস লাগিয়েছিল, ওরা একপাশে বসে ভোঁতা বুদ্ধি ধারাবার জন্যে নিদিধ্যাসন করছে। চিন্তার সাগরে থই নেই বিধায় ওরা ঠাঁই পাচ্ছেনা এবং আক্কেলের বালোকাবেলায় বসে ভোঁতা বুদ্ধি ধারাতেও পারছে না।
কয়েক চশমাআলা এক বেঞ্চে বসে ঘি-চমচম চিবাচ্ছিল আর শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল। হঠাৎ কাকতালীয় কণ্ঠস্বর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়, “পরীক্ষাপত্রে প্রশ্নোত্তর লিখতে হবে না, শুধু প্রশ্ন-নম্বর বললে আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার হবে। পরীক্ষা পাশ করলে তোদেরকে আর ভড়কাব না।”
ওরা ঝম্পে উঠে বেঞ্চের পিছনে যেয়ে সভয়ে বললো, “মুহীব, তুই এখানে কী করছিস?”
পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা মল্লের মত তাগড়া মস্তান দাঁড়িয়ে পাছা ঝাড়তে ঝাড়তে উদাসকণ্ঠে বললো, “বই মেললে ছাপারাক্ষরে প্রিয়তমার অবয়ব স্পষ্ট হয়। বিমনা হয়ে চোখ বুজলে, মনশ্চক্ষে মানসীর মুখচ্ছবি দেখি। মনশ্চাঞ্চল্যে বিচঞ্চল হলে, প্রাণোচ্ছল হয়ে খলখল করে হাসে। উদাসদৃষ্টে শূন্য হাতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, মেন্দির রঙ্গে রাঙ্গা প্রেয়সীর হাত ধরে বনবাসে যাচ্ছি।”
একজন সভয়ে বললো, “এসব কীসব বলছিস বুঝিয়ে বল।”
মুহীব বিদ্রূপ হেসে মাথা নেড়ে বললো, “ইউনিভার্সিটির উঠানে তোদের সাথে সাক্ষাৎ না হলে, বাপের জন্মে তোরা আর পরীক্ষার দেয়াল টপকাতে পারবে না।”
“কেন?”
“ভূতপূর্ণিমায় তোদেরকে আমি পাগল বানাব। পাগল হয়ে তোরা ছাগলের সাথে ঢুসা-ঢুসি করবে। গল্পগাছায় হাত পা বেঁধে আমি তোদেরকে দিকদারি দেব।” বলে মুহীব শরীর কাঁপিয়ে হাসলে এক চশমাআলা সভয়ে বললো, “কাগজ কলম থাকলে জলদি দে।”
“পরীক্ষা আগামী মাসে, এখন কাগজ কলম দিয়ে কী করবে?”
“প্রশ্ন-নম্বর লিখে দেব।”
“তা তুই কেমনে করবে?” বলে মুহীব বোয়াল মাছের মত হাঁ করে তাকায়।
“গূঢ়তত্ত্বে তাত্ত্বিক হওয়ার তথ্য জন্মসূত্রে পেয়েছি।” চশমাআলা চশমা ঠিক করে বললে মুহীব হতাশ হয়ে কাঁধ ঝুলিয়ে বললো, “আমি পুরাতাত্ত্বিক হতে চাই না, টুকলি না করে শুধু পরীক্ষায় পাশ করতে চাই।”
“অবশেষে আসল বিষয় তুই বুঝেছিস, এখন বাসায় যেয়ে আদেশ-নির্দেশাদি মেনে পাঠ্যক্রমানুযায়ী পাঠ্যপুস্তক পাঠে অভ্যাস্ত হলে প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করতে বেশি সময় লাগবে না।”
“কালন্দরের মত দোলে দোলে পড়া মুখস্থ করা সত্যি জবর জটিল কাজ।”
“পরীক্ষায় গোল্লা পেলে তোর বাবা তোকে আর মহিষীকে লাঙলে জোড়ে হাল চাষ করাবেন, আঁতেল হতে চাইলে আথালে কাজ করাবেন।”
“প্রশ্নোত্তর মুখস্থে ব্যস্ত হলে প্রিয়তমার বিধুবদন দেখার সুযোগ পাব না, আহ।”
“এক নম্বরে টপকালে ভাব জমিয়ে তোর সাথে পিরিতি করবে।”
“সত্যি বলছিস?”
“কানাঘুষো শোনেছি।”
“তোরা নির্ভয়ে ফুর্তিফার্তা কর, পাঠ্যপুস্তক কিনার জন্য আমি এখন দোকানে যাব।” বলে মুহীব দৌড়ে চলে যায়। পরদিন থেকে তার ছায়া দেখলে চশমাআলারা দৌড়ে শিক্ষকের পাশে বসে দোলে দোলে পড়া মুখস্থ করে। সে কারো সাথে কথা বলে না, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে। পরীক্ষা শেষ হলে ফলাফল জেনে ওরা গুনগুন করে এবং তাকে দেখলে চুপ হয়ে অন্যদিকে তাকায়। সজনীর বিধুবদন দেখতে না পেয়ে সে বেজার হয়ে চলে গেলে বন্ধু বান্ধবীরা এককাট্টা হয়ে আমর্ষে পরামর্শ করে। গতবছর বান্ধবীদের অপবাদের কারণ বন্দূরা বান্দরবন যেতে পারেনি, এবার ওরা সুন্দরবন যেতে চায়। সিলেট থেকে হাঁটাহাঁটি শুরু করলে কমপক্ষে অন্তত মাস খানেক লাগবে। সবাই চিন্তাফন্দি করছিল কিন্তু কারো আগে কেউ কিছু বলছিল না। হঠাৎ এক বান্ধবী বললো, “আমি আমার জীবনেও জলপ্রবাহের শব্দ শুনিনি। ইস! ঝর্ঝরিত জল কী সুন্দর ঝর্ঝর শব্দে আশমান থেকে গড়িয়ে পড়ে।”
আরেক বান্ধবী কপালে আঘাত করে বললো, “হায় রে আমার পুড়া কপাল, এক যুগ লেখাপড়া করেও জলপ্রবাহের অর্থ জানে না, মন চাইছে কিলিয়ে দুই চোখে নির্ঝর ঝরনা প্রবাহিত করি।”
এমন সময় বাতাসে কবিতা আবৃত্তি ভাসে, “তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কাছে আসো। বুকে পেতে দেব ফুলশয্যা। ওগো মোর প্রেয়সী।”

আরও পড়ার জন্য প্রচ্ছদে ক্লিক করুন

রোমাঞ্চকাহিনী | রহস্যউপন্যাস | ফিকশন | কিংবদন্তী | ভালোবাসার গল্প

© Mohammed Abdulhaque

সাহিত্যসংকলন