শৈলী | গল্প

সুরের_দেশের_রানীর_গল্প

গাইন হওয়ার জন্য পলাশতলে বসে পলাশমিঞা দিনমান গুনগুন করে। একদিন হঠাৎ ঝম্পে উঠে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে এক্কা দুক্কা খেলার ঘুঁটির মতন পাথর দেখে কপাল কুঁচকে দাঁড়ায় এবং পরখ করে তাকিয়ে পা দিয়ে মাটি সরিয়ে অগ্রসর হয়। পলাশ গাছের নিচে যেয়ে কপাল কুঁচকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মাথা উঁচিয়ে গাছের দিকে তাকায়। এমন সময় একটা ফুল ঝরে পড়ে। ফুল যেখানে পড়ে সেখানে যেয়ে চিন্তিত হয়ে অপলদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে বালি সরায়। শিল পাথরে খোদাই করা লেখা দেখে অত্যাশ্চর্য হয়ে দ্রুত তা হাতে নিয়ে আরো আশ্চর্য হয়। শিলাপাথরে যা লেখা তা একটা গান। পলাশ তাল লয় জানে না। সে যখন গান গায় তখন আড়ালে যায়ার জন্য কাক কোকিলে উড়াল দেয়। তার গান শোনে ভরা যৌবনে কেউ আড়কালা হতে চায় না। শিলা হাতে পলাশ হাঁটতে শুরু করলে গাছ থেকে অঝোরে ফুল ঝড়ে। যেন অভ্যর্থনার জন্য ফুল ছিটিয়ে কেউ তাকে মানদানে বন্দনা করছে। পলাশ সেদিকে খেয়াল না করে দ্রুত তার কামরায় যেয়ে কম্পিউটার চালিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে গানের সপ্টওয়্যার খুলে শব্দে সুরারোপ করায় ব্যস্ত হয়, ‘তোমার লগে আইজ নিশাত খেইড় খেলাইমো, খেইড় খেলাইমো বন্ধু খেইড় খেলাইমো। হাতে মেন্ধি গায়ে হলুদ পায়ে আলতা লাগাইমো, কুম কুম দিয়া আইজ তোমারে রাঙাইমো, তোমার লগে আইজ নিশাত খেইড় খেলাইমো- বন্ধু খেইড় খেলাইমো। কড়ি আইনছি ঘুঁটি আইনছি আরো আইনছি মইন, যৌবন পণ ধইরা আমি দান ফালাইমো, বন্ধু দান ফালাইমো, আইজ রাইতে তোমার লগে পাশা খেলাইমো, তোমার লগে আইজ নিশাত খেইড় খেলাইমো বন্ধু খেইড় খেলাইমো। ষোলো ঘুঁটির তিন দান জিতলে সোগাগিনী হইমো, কড়ি ফালাইয়া পাশা খেলাত হারলে রিতরস পাইমো, তোমার লগে আইজ নিশাত খেইড় খেলাইমো বন্ধু খেইড় খেলাইমো। গাঙগো নয়া পানি আইছে নৌকা বাইচ করমো, পুকরির ফন পানিত বন্ধু তোমার লগে লাই খেলাইমো, অতদিনে পাইছি তোমারে বন্ধু আইজ খেইড় খেলাইমো, তোমার লগে আইজ নিশাত খেইড় খেলাইমো বন্ধু খেইড় খেলাইমো।’
হঠাৎ বারোটার ঘণ্টি বাজলে আড়মোড়া দিয়ে শেষ বারের মত গান শুনার জন্য হেডফোন হাতে নিলে শান্ত-নারীকণ্ঠ বলল, ‘পলাশ, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
পলাশ চমকে বুকে থু থু দিয়ে চারপাশে তাকিয়ে কম্পিতকণ্ঠে বলল, ‘কে আমার সাথে কথা বলছ?’
‘আমার প্রেমীকবর আমাকে শৈলী ডাকতো। তুমিও আমাকে শৈলী ডাকতে পারবে। শৈলী শব্দ শুনতে নারী বাচক তাই না?’
‘জি, শুনতে মেয়েদের নামের মতন। তবে শৈলী শব্দের অর্থ রীতি, প্রণালী। আচার-ব্যবহার অথবা আহার-বিহারের বিশিষ্ট রীতি। শিল্প প্রভৃতির সম্পূর্ণ নিজস্ব ধাচ। গান নিশ্চয় আপনি লিখেছিলেন?’
‘হ্যাঁ, বন্ধুর সাথে খেইড় খেলাতে পারিনি।’
‘আমি আসলে গান গাইতে পারি না। আমি নতুন একটা গান লিখেছিলাম। আপনি শুনতে চাইলে শুনাব। আপনার কি সময় হবে?’
‘হ্যাঁ, শুনাও।’
পলাশ কথা না বলে গান চালায়, ‘প্রাণো বন্ধু রে বন্ধু ফিরে আও ঘরে, তোমার বিহনে সোনার তনু পইড়া আছে ঘরের দোয়ারে, প্রাণো বন্ধু রে, বন্ধু নিথর দেহ মুখে নাই রা মনের দুঃখ খুলে বলব কারে? বন্ধু তুমি নাই মোর বুকের মাঝারে, প্রাণো বন্ধু রে বন্ধু ফিরে আও ঘরে। প্রাণো বন্ধু রে, বন্ধু মনের দুঃখ মনে রইল অনুতাপ অন্তরে, ঘোর নিদানে বান্ধব নাই কেউ, সাথি নাই মোর আইন্ধার কইবরে, প্রাণো বন্ধু রে, বন্ধু ফিরে আও ঘরে।’

পলাশ থেমে বুক ভরে শ্বাস টানলে শান্ত নারীকণ্ঠ বলল…
‘জানো পলাশ? তোমার গান আমি তন্ময় হয়ে শুনি। তাল লয়, যতি ছেদ মাত্রা গুনে গায়করা গান গায়। তোমার মতো সাধকের শৈলী এবং শৈল্পিক চেতনা থেকেই শিল্পির জন্ম হয়। তুমি সাহস করে নিয়ম রীতি ভেঙে বিশিষ্ট রীতি তৈরী করো। মনের ভাব একাধিক ভাবে প্রকাশ করা যায়, তদ্রুপ একটা গান অনেক তাল লয়ে গাওয়া যায়। প্রচলিত সুরে না গেয়ে নতুন সুর এবং রাগে গাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়, শুধু সাধকরা তা পারে।’
‘আপনার কথা এবং উপস্থিতি আমাকে বিত্রস্ত করেছে। আমার গায়ে বার বার কাটা দিচ্ছে। আমি এখন টুনিজানির বগলে যেতে চাই।’ বলে পলাশ কান্নার ভান করে ডানে বাঁয়ে তাকালে নারীকণ্ঠ খিলখিল করে হেসে বলল, ‘শাঁকচুন্নি নই আমি হলাম সুরের দেশের রানী।’

-সমাপ্ত –

বইর নাম — আঠারোটা অসমাপ্ত প্রমোপন্যাস

© Mohammed Abdulhaque

উপন্যাস সমগ্র